৬ দফার পথরেখা

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ৬ দফা উপস্থাপন করার পর গ্রেপ্তার হন ৮ মে। তার রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারাভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি পাকিস্তান সরকারের আমলে কারাগারে ছিলেন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের পরিকল্পনা করেছিলেন। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ছিল তারই চূড়ান্ত রূপরেখা। ছয় দফা দেয়ার পর জাতির পিতা যেখানে সমাবেশ করতে গেছেন, সেখানেই গ্রেপ্তার হয়েছেন। ওই সময়ে তিনি ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ দিন কারাভোগ করেন। আর ৬৬ সালের ৮ মে আবারো গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। এ সময় তিনি ১ হাজার ২১ দিন কারাগারে ছিলেন।

দুই.

১৯৬৫ সালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও আপত্তিকর বক্তব্য প্রদানের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। পরবর্তীকালে হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি লাভ করেন। পুনরায় তার দীর্ঘ কারাজীবনের সূচনা ঘটে ছয় দফাকে কেন্দ্র করে।

প্রস্তাবিত ছয় দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ। ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ছয় দফার পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারা পূর্ববাংলায় গণসংযোগ সফর শুরু করেন। এ সময় তাকে সিলেট, যশোর, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বারবার গ্রেপ্তার করা হয়। শেখ মুজিব এ বছরের প্রথম ৩ মাসে আটবার গ্রেপ্তার হন। এবার তিনি একনাগাড়ে প্রায় ৩ বছর কারাবাস করেন। ৭ জুন বঙ্গবন্ধু ও আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে এবং ছয় দফার সমর্থনে সারাদেশে হরতাল পালিত হয়। হরতালের সময় ঢাকার তেজগাঁও, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীতে পুলিশের গুলিতে মনু মিয়াসহ কয়েকজন নিহত হন। এই দিনই বাঙালির আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ছয় দফা বাংলাদেশের মহাসনদে (ম্যাগনাকার্টা) পরিণত হয়। এই ছয় দফার ফলাফল হলো ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধুর জেলমুক্তি, এর ফলাফল হলো সত্তরের নির্বাচনে বিপুল ভোটে আওয়ামী লীগের জয় লাভ, আর তারপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তার শেষ পরিণতি অর্জন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণেও ৬ দফার উল্লেখ আছে এবং তার ১৯৬৬ সালের ভাবনার প্রকাশও লক্ষণীয়। পাকিস্তানি শাসনের ২৩ বছরের ইতিহাসে বাঙালির শোষণ-নির্যাতনের কথা বলার সময় তিনি ৭ মার্চের ভাষণে ৬ দফার কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, স্বাধিকার আদায়ের লড়াইয়ের অনুপুঙ্খ বিবরণ সমৃদ্ধ ভাষণটি। ১৮ মিনিট স্থায়ী এই ভাষণে তিনি পূর্ব বাংলার বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেস্কো ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারে’ (এমওডব্লিউ) তালিকাভুক্ত করেছে। ‘এমওডব্লিউতে এটাই প্রথম কোনো বাংলাদেশি দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়- ‘২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্ত দানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয় লাভ করেও ক্ষমতায় বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে দেশে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রাখল। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা দেয়া হলো এবং এরপর এ অপরাধে আমার বহু ভাইকে হত্যা করা হলো। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের মুখে আইয়ুবের পতনের পর ইয়াহিয়া খান এলেন। তিনি বললেন, তিনি জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন, শাসনতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম। তার পরের ঘটনা সবাই জানেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা হলো আমরা তাকে ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করলাম। কিন্তু ‘মেজরিটি’ পার্টির নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমার কথা শুনলেন না।’… মওলানা নুরানী ও মুফতি মাহমুদসহ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য পার্লামেন্টারি নেতারা এলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা হলো- উদ্দেশ্য ছিল আলাপ-আলোচনা করে শাসনতন্ত্র রচনা করব। তবে তাদের আমি জানিয়ে দিয়েছি ৬ দফা পরিবর্তনের কোনো অধিকার আমার নেই, এটা জনগণের সম্পদ।’…

৬ দফার শেষ দফায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন তিনি মানুষের খাদেম; জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাকি জীবন ত্যাগ করতে পারবেন। তারই প্রতিফলন দেখা যায় ৭ মার্চের ভাষণের এ কথায়- ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, মানুষের অধিকার চাই।’…

তিনি ১৯৬৬ সালে কারাগারে থেকেও দেখেছিলেন ছয় দফা দাবির জন্য মানুষকে রক্ত দিতে এবং আন্দোলন পরিচালনা করতে। এ জন্য ১৯৭১ সালে এসে বললেন ‘হুকুম দিবার জন্য আমি যদি না থাকি, আমার সহকর্মীরা যদি না থাকেন, আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।’

এভাবে সেদিন তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ তিনি সব সময় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অধিকার আদায়ে বিশ্বাস করতেন। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় ৬ দফা এবং আন্দোলন সম্পর্কে তার এসব অভিব্যক্তিই প্রকাশিত হয়েছে।

১৯৬৬-১৯৬৯ বন্দির সময় ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ডায়েরির খাতায় লিপিবদ্ধ দিনলিপি স্থান পেয়েছে ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে। বিশেষত তার গ্রেপ্তারের পর তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পত্রপত্রিকার অবস্থা, শাসকদের নির্যাতন, ৬ দফা বাদ দিয়ে মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার শাসকদের চেষ্টা ইত্যাদি বিষয় তিনি তুলে ধরেছেন। আজীবন মানুষের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছেন যার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা অর্জন। বাংলার মানুষ যে স্বাধীন হবে, এ আত্মবিশ্বাস বারবার তার ৬ দফা কেন্দ্রিক লেখায় ফুটে উঠেছে। এত আত্মপ্রত্যয় নিয়ে পৃথিবীর আর কোনো নেতা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেননি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ধাপে ধাপে মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত ও উজ্জীবিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ৬ দফা ছিল মুক্তির সনদ, সংগ্রামের পথ বেয়ে যা এক দফায় পরিণত হয়েছিল, সেই এক দফা স্বাধীনতা। সে সময় অত্যন্ত সুচারুরূপে পরিকল্পনা করে প্রতিটি পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেছিলেন। সামরিক শাসকগোষ্ঠী হয়তো কিছুটা ধারণা করেছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে তারা হার মানতে বাধ্য হয়েছিল। ৬ দফাকে বাদ দিয়ে কয়েকটি ধারার দল জোট বেঁধে ৮ দফা দাবিসহ আন্দোলন ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সে কাহিনিও রোজনামচায় পাওয়া যায়।

বিনা বিচারেই বঙ্গবন্ধুকে দীর্ঘদিন একাকী কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তাঁর অপরাধ ছিল তিনি বাংলার মানুষের অধিকারের কথা বারবার বলেছেন। তাঁর শরীর মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে যেত। তবু বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন তথা ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। বাংলার শোষিত বঞ্চিত মানুষকে শোষণের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে উন্নত জীবন প্রদানের স্বপ্ন ছিল তাঁর। আন্দোলন ও হরতালকে কেন্দ্র করে কারাগারে ধরে আনা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল। অর্থাৎ দলের প্রতিটি সদস্যকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন, তাদের কল্যাণে কত চিন্তিত থাকতেন সে কথাও লিপিবদ্ধ রয়েছে। একাকী থাকা, আর অসুস্থ মার কথা ছাড়া তিনি নিজের কষ্টের কথা বলেননি। জনগণের কষ্টের বিষ ধারণ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নীলকণ্ঠ।

‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধুর নিজের দিনপঞ্জি পাঠ করলে তৎকালীন সময় ও ইতিহাসকে নিবিড়ভাবে জানা সম্ভব হয় আমাদের। তবে এখানে আন্দোলন, রাজনৈতিক খবর ও বঙ্গবন্ধুর নিজের মনোজগৎকে তুলে ধরার জন্য জেলখানার অন্যান্য প্রসঙ্গ বাদ দেয়া হয়েছে। জুনের ২-৯ তারিখ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব বয়ানে ছয় দফা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মুহূর্ত, শাসকের অন্যায় আচরণ আর নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগের কথা হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে।

৬ জুন ১৯৬৬, সোমবার

আগামীকাল ধর্মঘট। পূর্ব বাংলার জনগণকে আমি জানি, হরতাল তারা করবে। রাজবন্দিদের মুক্তি তারা চাইবে। ছয় দফা সমর্থন করবে। তবে মোনায়েম খান সাহেব যেভাবে উস্কানি দিতেছেন, তাতে গোলমাল বাধাবার চেষ্টা যে তিনি করছেন। এটা বুঝতে পারছি। জনসমর্থন যে তার সরকারের নাই তা তিনি বুঝেও, বোঝেন না।

…ধরপাকড় চলছে সমানে। কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে। যশোর আওয়ামী লীগ অফিস তল্লাশি করেছে। ভূতপূর্ব মন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা মশিয়ুর রহমান প্রতিবাদ করেছেন। নুরুল আমীন সাহেব আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতাদের গ্রেপ্তারের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং মুক্তি দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, শত্রæবিনাশের জন্য রচিত আইনে দেশবরেণ্য নেতাদের গ্রেপ্তার দেশবাসীকে স্তম্ভিত করিয়াছে। ঢাকার মৌলিক গণতন্ত্রী সদস্যরা এক যুক্ত বিবৃতিতে আমাকেসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবি করিয়াছে, আর ৬ দফার দাবিকে সমর্থন করিয়াছে এবং জনগণকে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানাইয়াছে।

৯ জন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপিও ধরপাকড়ের তীব্র প্রতিবাদ করিয়াছে এবং তাদের মুক্তি দাবি করিয়াছেন। আওয়ামী লীগ, শ্রমিক, ছাত্র ও যুব কর্মীরা হরতালকে সমর্থন করে পথসভা করে চলেছে। মশাল শোভাযাত্রাও একটি বের করেছে। শত অত্যাচার ও নির্যাতনেও কর্মীরা ভেঙে পড়ে নাই। আন্দোলন চালাইয়া চলেছে। নিশ্চয়ই আদায় হবে জনগণের দাবি।

গভর্নর নারায়ণগঞ্জ জনসভায় আবার হুমকি ছেড়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা ভঙের চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমন করবেন। আইনশৃঙ্খলা আওয়ামী লীগ কোনোদিন ভাঙতে চায় নাই। তারা বিশ্বাসও করে না ওই রাজনীতিতে। কিন্তু যিনি আইনশৃঙ্খলার মালিক হয়ে আইনশৃঙ্খলা ভাঙতে উস্কানি দিতেছেন, তার বিচার কে করবে? যার সরকার বেআইনি এবং অন্যায়ভাবে কর্মীদের হয়রানি করছেন, গ্রেপ্তার করছেন তার বিচার কবে হবে? মোনায়েম খান সাহেবের জানা উচিত ১৯৪৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ কর্মীরা অনেকবার জেলে গেছেন, মিথ্যা মামলার আসামিও হয়েছেন। পূর্বের সরকার এবং মুখপাত্ররা এ রকম হুমকি অনেকবার দিয়েছেন।

সরকার কর্মীদের বন্দি করেও অত্যাচার করেছে, ২৪ ঘণ্টা তালা বন্ধ করে রেখেছে জেলের মধ্যে। নারায়ণগঞ্জে মোস্তফা সারওয়ার, শামসুল হক ভূতপূর্ব এম পিএ, হাফেজ মুছা সাহেব, আবদুল মোমিন অ্যাডভোকেট, ওবায়দুর রহমান, শাহাবুদ্দিন চৌধুরীর মতো নেতৃবৃন্দকে ‘সি’ ক্লাস করে রাখা হয়েছে। কি করে এই সরকার সভ্য সরকার বলে দাবি করতে পারে আমি ভেবেও পাই না!

…ভাবি শুধু আমার সহকর্মীদের কথা। একেক জনকে আলাদা আলাদা জেলে নিয়ে কীভাবে রেখেছে? ত্যাগ বৃথা যাবে না, যায় নাই কোনোদিন। নিজে ভোগ নাও করতে পারি, দেখে যেতে নাও পারি, তবে ভবিষ্যৎ বংশধররা আজাদী ভোগ করতে পারবে। কারাগারের পাষাণ প্রাচীর আমাকেও পাষাণ করে তুলেছে। এ দেশের লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মা-বোনের দোয়া আছে আমাদের ওপর। জয়ী আমরা হবই। ত্যাগের মাধ্যমেই আদর্শের জয় হয়।…

৭ জুন ১৯৬৬, মঙ্গলবার

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কী হয় আজ? আবদুল মোনায়েম খান যেভাবে কথা বলছেন, তাতে মনে হয় কিছু একটা ঘটবে আজ। কারাগারের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করে খবর এলো দোকানপাট, গাড়ি, বাস, রিকশা সব বন্ধ। শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল চলেছে। এই সংগ্রাম একলা আওয়ামী লীগই চালাইতেছে। আবার সংবাদ পাইলাম পুলিশ আনছার দিয়ে ঢাকা শহর ভরে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস নিশ্চয়ই জনগণ বেআইনি কিছুই করবে না। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার প্রত্যেক গণতান্ত্রিক দেশের মানুষের রয়েছে। কিন্তু এরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে দেবে না। আবার খবর এলো টিয়ার গ্যাস ছেড়েছে। লাঠিচার্জ হইতেছে সমস্ত ঢাকায়। আমি তো কিছুই বুঝতে পারি না। কয়েদিরা কয়েদিদের বলে। সিপাইরা সিপাইদের বলে। এই বলাবলির ভিতর থেকে কিছু খবর বের করে নিতে কষ্ট হয় না। তবে জেলের মধ্যে মাঝে মাঝে প্রবল গুজবও রটে।

অনেক সময় এসব গুজব সত্যই হয়, আবার অনেক সময় দেখা যায় একদম মিথ্যা গুজব। কিছু লোক গ্রেপ্তার হয়ে জেল অফিসে এসেছে। তার মধ্যে ছোট ছোট বাচ্চাই বেশি। রাস্তা থেকে ধরে এনেছে। ১২টার পরে খবর পাকাপাকি পাওয়া গেল যে হরতাল হয়েছে, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। তারা ছয় দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়, বাঁচতে চায়, খেতে চায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা চায়। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, কৃষকের বাঁচবার দাবি তারা চায়- এর প্রমাণ এই হরতালের মধ্যে হয়েই গেল।

এ খবর শুনলেও আমার মনকে বুঝাতে পারছি না। একবার বাইরে একবার ভিতরে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। বন্দি আমি, জনগণের মঙ্গল কামনা ছাড়া আর কী করতে পারি! বিকালে আবার গুজব শুনলাম গুলি হয়েছে, কিছু লোক মারা গেছে। অনেক লোক জখম হয়েছে। মেডিকেল হাসপাতালেও একজন মারা গেছে। একবার আমার মন বলে, হতেও পারে, আবার ভাবি সরকার কি এত বোকামি করবে? ১৪৪ ধারা দেয়া হয় নাই। গুলি চলবে কেন? একটু পরেই খবর এলো ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। মিটিং হতে পারবে না। কিছু জায়গায় টিয়ার গ্যাস মারছে সে খবর পাওয়া গেল।

বিকালে আরো বহুলোক গ্রেপ্তার হয়ে এলো। প্রত্যেককে সামারি কোর্ট করে। সাজা দিয়ে দেয়া হয়েছে। কাহাকেও এক মাস, কাহাকে দুই মাস। বেশির ভাগ লোকই রাস্তা থেকে ধরে এনেছে শুনলাম। অনেকে নাকি বলে রাস্তা দিয়া যাইতেছিলাম ধরে নিয়ে এলো। আবার জেলও দিয়ে দিল। সমস্ত দিনটা পাগলের মতোই কাটল আমার। তালাবদ্ধ হওয়ার পূর্বে খবর পেলাম নারায়ণগঞ্জ, তেজগাঁ, কার্জন হল ও পুরান ঢাকার কোথাও কোথাও গুলি হয়েছে, তাতে অনেক লোক মারা গেছে।

বুঝতে পারি না সত্য কি মিথ্যা। কাউকে জিজ্ঞাসা করতে পারি না। সিপাইরা আলোচনা করে, তার থেকে কয়েদিরা শুনে আমাকে কিছু কিছু বলে।

তবে হরতাল যে সাফল্যজনকভাবে পালন করা হয়েছে সে কথা সকলেই বলছে। এমন হরতাল নাকি কোনোদিন হয় নাই, এমনকি ২৯ সেপ্টেম্বরও না। তবে আমার মনে হয় ২৯ সেপ্টেম্বরের মতোই হয়েছে হরতাল। গুলি ও মৃত্যুর খবর পেয়ে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। …কি হবে? কি হইতেছে? দেশকে এরা কোথায় নিয়ে যাবে, নানা ভাবনায় মনটা আমার অস্থির হয়ে রয়েছে। এমনিভাবে দিন শেষ হয়ে এলো। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা জেলে আছি। তবুও কর্মীরা, ছাত্ররা ও শ্রমিকরা যে আন্দোলন চালাইয়া যাইতেছে, তাদের জন্য ভালোবাসা দেয়া ছাড়া আমার দেবার কিছুই নাই।

মনে শক্তি ফিরে এলো এবং আমি দিব্যচোখে দেখতে পেলাম ‘জয় আমাদের অবধারিত। কোনো শক্তি আর দমাতে পারবে না। …

দৈনিক আজাদ পত্রিকা সংবাদ পরিবেশন ভালোই করেছে, ‘আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আজ প্রদেশে হরতাল।’ হরতালকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আওয়ামী লীগের একক প্রচেষ্টা। প্রোগ্রামটাও দিয়েছে ভালো করে। পাকিস্তান অবজারভার হেড লাইন করেছে ‘হরতাল’ বলে। খবর মন্দ দেয় নাই। মিজানের বিবৃতিটি চমৎকার হয়েছে। হলে কি হবে, ‘চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি’।

তিন.

বঙ্গবন্ধুর নিজের বিবরণ থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ৬ দফা রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের এজেন্ডা থেকে জনগণের অন্যতম দাবিনামায় পরিণত হয়েছিল, যা নিয়ে একটানা আন্দোলন শুরু হয়। ওই দাবিগুলো ছিল ন্যায়সঙ্গত আর এ জন্য তা জনসমর্থন পায়। ৭ জুন শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ছয় দফার দাবি বাঙালির মুক্তির সনদে পরিণত হয় এবং এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রস্তুত করে দেয়। ছয় দফা ও এর সমর্থনে আওয়ামী লীগের ডাকা ৭ জুন হরতালের দিন পুলিশের গুলিতে বহু হতাহতের ঘটনার সময় বঙ্গবন্ধু ও প্রথম সারির নেতারা ছিলেন কারাগারে বন্দি। শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ওই নেতাদেরই ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জেল থেকে বের করে এনেছিল জনগণ। স্বাধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে জনগণের আত্মত্যাগই মহিমান্বিত হয়ে ৭ জুন ছয় দফা দিবসের মর্যাদা লাভ করেছে। ছয় দফা গণদাবিতে পরিণত হওয়ার ফলে ১৯৬৯ সালের ২২ মার্চ আইয়ুব খানের প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রদানের প্রস্তাবে সাড়া দেননি বঙ্গবন্ধু। কারণ নিজের স্বার্থে সেই গণদাবি বিনিময় করতে অপারগ ছিলেন তিনি।

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন