বাংলাদেশের পরমাণু যুগের স্বপ্নদ্রষ্টা

তাপস হালদার

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

স্বনামে পরিচিত পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরমাণুবিজ্ঞানী। ড. ওয়াজেদ মিয়া পারিবারিকভাবে সুধা মিয়া নামে পরিচিত। তিনি ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবদুল কাদের মিয়া এবং মাতা ময়েজুন্নেসার কনিষ্ঠ পুত্র।

তিনি ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
ড. ওয়াজেদ মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। প্রথম বর্ষেই ছাত্রলীগে যোগদান করেন। ছাত্রলীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৬১-৬২ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

নির্বাচিত হয়ে ১৯৬২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন, সেটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম সাক্ষাৎ। বঙ্গবন্ধুর দর্শনে উজ্জীবিত হয়ে আইয়ুববিরোধী শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন।
ছাত্র ও কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করেন।

১৯৬৩ সালে তৎকালীন পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদান করেন। ১৯৬৭ সালে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করে স্বদেশে ফিরে এসে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালের মার্চে আণবিক গবেষণা কেন্দ্রে ‘আণবিক রিঅ্যাক্টর বিজ্ঞানে’ উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য জার্মানি যান। ১৯৭৫ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারতের দিল্লিতে অবস্থিত আণবিক শক্তি কমিশনের ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন। ১৯৯৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর গ্রহণ করেন।
২০০১ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ‘বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ’ গঠন করেন। আমৃত্যু সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ড. ওয়াজেদ মিয়ার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশ একদিন পরমাণু শক্তিসম্পন্ন দেশ হবে। সে লক্ষ্যেই ১৯৯৭ সালে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই কাজকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁর স্বপ্ন, সাধনা ও চিন্তার ফসল আজকের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ পিছিয়ে যায়। ড. ওয়াজেদ মিয়ার স্বপ্ন আজ তাঁরই সুযোগ্য সহধর্মিণীর হাতে বাস্তবায়িত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করেছে।

ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কর্মকে স্মরণীয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে সরকার তাঁর নামে বেশ কিছু গবেষণাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিজ্ঞানাগার ‘এম এ ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র’, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ড. ওয়াজেদ রিসার্চ ইনস্টিটিউট’, নাটোরে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরে ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া ড. ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘বিজ্ঞান চর্চা করি, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ি’ স্লোগানকে সামনে রেখে সেমিনার, প্রতিযোগিতা ও গণসচেতনতামূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা হচ্ছে।

ড. ওয়াজেদ মিয়ার গবেষণামূলক ও বিজ্ঞানবিষয়ক বহু প্রবন্ধ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রপত্রিকা এবং সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য পদার্থবিজ্ঞান, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, প্রকৌশলবিষয়ক Fundamental of Thermodynamics ‰es Fundamental of Electromagnetics নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ এবং ‘বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকারের চালচিত্র’ নামেও তিনি দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে।

ড. ওয়াজেদ মিয়া ক্ষমতার মোহকে দূরে রেখে গবেষণাজগতেই বিচরণ করেছেন। দেশের উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। তিনি রাজনীতির মধ্য দিয়ে ছাত্রজীবন শুরু করলেও ছিলেন একজন পুরোদস্তুর বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানমনস্কতা তাঁর জীবনের প্রতিটি কর্মে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। কর্মজীবনে মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা দিয়ে দেশের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

ড. ওয়াজেদ মিয়া ২০০৯ সালের ৯ মে মাত্র ৬৭ বছর বয়সে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান। পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। নির্লোভ, নিরহংকার, সৎ ও খ্যাতনামা বিজ্ঞানীর মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন