একাত্তরের রণাঙ্গনে ঈদ উদযাপন – স্বজনদের কথা ভেবে কেঁদেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা

তাহমিন হক ববী

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কেবলমাত্র একটি ঈদ (ঈদুল ফিতর) পালিত হয়েছিল। ঈদুল আজহা এসেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ঈদ হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঈদুল ফিতর উদ্যাপিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২০ নভেম্বর। ওই সময় মুক্তিকামী বাঙালিরা আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠায় ঈদ উদ্যাপন করেছিল। ঘুরে বেড়ানোর পরিবর্তে মানুষ বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছে নিজ নিজ ঘরে। শরণার্থীরা ঈদ কাটিয়েছেন তাদের জন্য নির্ধারিত শিবিরে। ঈদের সেই দিনটিতে স্বজনদের কথা ভেবে কেঁদেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। সবারই প্রায় একই কাহিনী। যুদ্ধকালীন ওই ঈদে অনেক মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিলেন বাংলাদেশের ভূখন্ডে সম্মুখ যুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ঈদ ছিল পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের জন্য চরম পরীক্ষা। বিশেষ করে রমজান মাসজুড়েও পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দালালরা একের পর এক গণহত্যা, লুটপাট আর ধর্ষণের মহোৎসব চালিয়েছে। এদিন পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের ৬ নম্বর সেক্টরের কুড়িগ্রামের রায়গঞ্জ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন ছয় নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আশফাকুস সামাদ বীর উত্তমসহ রণাঙ্গনের অনেক মুক্তিযোদ্ধা।

একাত্তরে অবরুদ্ধ ঢাকার ঈদও ছিল অন্য রকম। যুদ্ধময় সেই দিনে পবিত্র ঈদুল ফিতরের একটি দিনের বর্ণনা দিয়েছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে তিনি লিখেছেনÑ ‘আজ ঈদ। ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারও জামা-কাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালার কাপড় কাচা হয়নি, ঘরের ঝুল ঝাড়া হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদানি। শরীফ, জামি ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি। কিন্তু আমি ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রান্না করেছি।

যদি রুমির কোনো সহযোদ্ধা আসে এই বাড়িতে! তাদের খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াব। তাদের জামায় লাগিয়ে দেওয়ার জন্য এক শিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।’ (পৃষ্ঠা :২৪৪)
ঢাকার মতো ১৯৭১ সালে ঈদ এসেছিল কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে। সেখানে প্রায় এক কোটি শরণার্থী নিরন্ন, রোগে জর্জরিত। বর্ষায় সৃষ্ট কাদায় প্রতিনিয়ত মৃত্যুর হাতছানি। অন্যদিকে কলকাতার থিয়েটার রোডে (বর্তমান শেক্সপিয়ার সরণি) মুজিবনগর সরকারের কার্যালয়েও ঈদ উদযাপিত হয়েছিল ভিন্নভাবে। ওইদিন সরকারের পক্ষ থেকে ছুটি ঘোষণা করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে ভাষণ দেন। মুজিবনগর সরকারের কার্যালয়ের সামনের ছোট্ট মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ঈদ জামাত।

ওইদিন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসী সরকারের কার্যালয়ে বিভিন্ন উপহার পাঠানো হয়। যেগুলোর মধ্যে ছিল মিষ্টান্ন, শুকনো খাবার। যতদূর জানা যায়, ওই কার্যালয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাঠানো সামান্য উপহার গ্রহণ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে আর কোনো আয়োজন ছিল না। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঈদ উদযাপনে আড়ম্বর বা অতিরিক্ত খাবারের আয়োজনের পক্ষে ছিলেন না। তবে, ওই রাতে কুষ্টিয়ায় একটা ক্যা¤প পরিদর্শনে যান তিনি। যোদ্ধাদের সঙ্গে কোলাকুলি করেন।

তাদের হাতে তুলে দেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফ থেকে পাঠানো সামান্য মিষ্টান্ন ও শুকনো খাবার। রাতে অনেকটা সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাটিয়ে ভোরে আবার কলকাতায় ফিরে আসেন তাজউদ্দীন।

ঈদের আগের দিন তথা ২৯ রমজান কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র সাপ্তাহিক জয় বাংলা। যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বাণী এই উপলক্ষে বক্স আইটেম করে পত্রিকাটি। এই ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক এই শিরোনামে লেখা হয়, ‘আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে। দখলীকৃত এলাকায় শক্রসৈন্যের তা-ব চলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত হয়ে শরণার্থী হয়েছে। মুক্ত এলাকায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি চলছে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য।

এবার ঈদে আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে শুধু স্বজন হারানোর শোক, দুর্জয় সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগের প্রবল সংকল্প। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনসাধারণকে ঈদ উপলক্ষে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। ঈদের যে আনন্দ আজ আমরা হারিয়েছি, তা আমাদের জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে সেদিনই, যেদিন আমরা দেশকে সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত করব।

আমি আপনাদের আশ্বাস দিচ্ছি, যথাসর্বস্ব পণ করে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমরা লিপ্ত, তার চূড়ান্ত সাফল্যের দিনটি নিকটতর হয়ে এসেছে। সেই মুহূর্তটিকে এগিয়ে আনার সংগ্রামে আমরা সবাই যেন নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের নিয়োগ করতে পারি, এই ঈদে তাই হোক আমাদের প্রার্থনা।’
ঈদ উপলক্ষে সাপ্তাহিক জয় বাংলার ২৮তম সংখ্যায় সম্পাদকীয় কলামে ‘উৎসবের ঈদ নয়, ত্যাগের ঈদ’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বাণী প্রকাশ করে। যদিও বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের জেলে বন্দি। ওই বাণীতে বলা হয়, ‘আমি নিজেকে বাঙালি ভাবতে গর্ববোধ করি। বহতা নদীর মতো আমাদের সংস্কৃতির ধারাও বেগবতী ও প্রাণাবেগপূর্ণ। আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হলে বাঙালি আবার বিশ্বসভায় মাথা তুলে দাঁড়াবে। বাঙালি হওয়ার সঙ্গে ধর্মে মুসলমান থাকার কোনো বিরোধ নেই। একটি আমার ধর্ম।

অন্যটি জাতি পরিচয়। ধর্ম আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচার। জাতি পরিচয় আমার সমষ্টিগত ঐতিহ্য। একজন হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি অথবা বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান বাঙালি মধ্যে পার্থক্য এটুকুই যে, তাদের ধর্মমত শুধু আলাদা। কিন্তু খাদ্য, রুচি, ভৌগোলিক পরিবেশ, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, বর্ণ ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিক থেকে তারা অভিন্ন।

ঈদের পরদিন থেকে আবার যুদ্ধ কৌশল আর নানা বিষয় নিয়ে ব্যস্ততা বাড়ে। হাতে সময় নেই। রণাঙ্গনে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেন মুক্তিযোদ্ধারা।

আরও পড়ুন