বাঙালি জাতির মহাকাব্য

মিছবাহ্ উদ্দিন

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

৭ মার্চ ভাষণের অনন্য তিনটি বৈশিষ্ট্য-১) অলিখিত, ২) তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবে একটি শক্তিশালী উপস্থাপনা এবং ৩) ভাষণের মাঝে মাঝে আঞ্চলিক ও লোকায়ত শব্দের প্রয়োগ। এ ভাষণ দিয়ে শেখ মুজিব জাতিকে মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই ভাষণ চিরজীবী বাংলাদেশের জন্য চিরন্তন দলিল। এই ভাষণের বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়নেই কেবল বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে। জাতির মুক্তি সংগ্রাম ক্রমপরিণতির রূপ লাভ করবে

দেশ ভাগের পর ২৩ বছরের ইতিহাসে অনেক ভাষণ জাতি শুনেছে, জাতির উদ্দেশে দেওয়া হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের তো বটেই, আরও অনেক নেতার। কিন্তু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ওই একটি মাত্র ভাষণ দেশ ও জাতির দিকনির্দেশক ভিত্তি, বিশ্বের দালিলিক ঐতিহ্য, যা বাঙালি জাতির গর্ব। এমনকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যতগুলো ভাষণ আছে তন্মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণ অন্যতম। বিশ্বের এক অনন্য বক্তৃতা আলেখ্য।

সর্বজনগ্রাহ্য বক্তৃতা বিশারদ, গবেষক ও যোগাযোগবিদদের জন্য এই ঐতিহাসিক ভাষণ আবশ্যিক পাঠ্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে দেশে-বিদেশে। এ ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি Speech Definition-এ প্রবেশ করেছিলেন, যা পাঁচ দশকের অধিক সময়কাল আগে ছিল অকল্পনীয়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ১৯৪০ সালে তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেন- ‘We shall fight on the beaches, we shall fight on the landing grounds —we shall never surrender’। এখানে ‘we shall fight’ speech definition বা বক্তৃতার সংজ্ঞা।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং ১৯৬৩ সালের ২৮ আগস্ট যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেটার ‘বক্তৃতা সংজ্ঞা’ ছিল- ‘ও যধাব ধ ফৎবধস’. যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেণ্ট আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর গেটিসবার্গ বক্তৃতায় বলেছিলেন- ‘and the government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth. বক্তৃতার সংজ্ঞায় এসব বিশ্ব মানবের পাথেয়।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহেরুর ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট মধ্যরাতে প্রদত্ত ভাষণে- ‘A tryst of destiû’ একইভাবে বক্তৃতায় সংজ্ঞা নির্ধারণ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একইভাবে- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে ‘speech definition’ তৈরি করেন। তাঁর ক্ষুরধার কথা, একটার পর একটা যুক্তি, প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন ওই ভাষণে। এ প্রসঙ্গে ডেল কার্নেগির একটা উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন- ‘The best arguments is that which seems merely an explanation’. অর্থাৎ, ‘সর্বোত্তম যুক্তিই হচ্ছে সঠিক বাক্য’। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিও সেসব সার্বিক ঘটনার পূর্বাপর প্রাঞ্জল ব্যাখ্যায় সময়ের আলোকে অধিক যুক্তিগ্রাহ্য বলা যায়।
৭ মার্চের ভাষণটি বঙ্গবন্ধুর extempore speech হলেও যে বিষয়টি লক্ষণীয় ও উপস্থিত বক্তৃতার সচরাচর পরিদৃষ্ট হয়ে থাকে তা থেকে ব্যতিক্রম ছিল। তাতে বিরক্তিকর পুনরাবৃত্তি, শব্দচয়নে মুহূর্তের দ্বিধাগ্রস্ততা কিছুই ছিল না। এমনকি ভাষণটির কোনো স্ক্রিপ্টও ছিল না। মঞ্চে উঠার আগে গাড়িতে ড্রাইভার হাজী মোর্শেদ বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন- ‘আপনি ভাষণে কী বলবেন কিছুই তো লিখে আনেননি।’ মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিচল আস্থায় প্রতি উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-‘দেখি আল্লায় কী বলায়’।

জাতির প্রতি সত্যনিষ্ঠ অঙ্গীকারে সেদিন বঙ্গবন্ধু মহাকাব্যিক বাণীতে জাতিকে বিমোহিত করেছিলেন। মুগ্ধ চিত্তে জাতি ফিরে গিয়েছিল শাণিত স্বাধীনতা চেতনার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। ‘ভায়েরা আমার’ নিখাদ সম্বোধনে উপস্থিত ১০ লক্ষাধিক এবং দেশের সমগ্র জাতির হৃদয়ে ঢুকে গিয়েছিলেন শেখ মুজিব। সমগ্র ভাষণে তিনি সক্রেটিসের তর্কের ধারা অনুসরণ করেছিলেন। একটির পর একটি প্রশ্ন, একটার পর একটা যুক্তি অবতারণা করে স্বেচ্ছাচারী স্বৈরাচারের খুঁতগুলো জাতির সামনে তিনি স্পষ্ট করে তুলেছিলেন।

ক্ষুরধার যুক্তির খাতিরেই তিনি শূন্যগর্ভ শব্দে বা Hollwo claptrap-এ বিশ্বাসী ছিলেন না। এই ভাষণে রাজনীতির কোনো মারপ্যাঁচ ছিল না। দুর্বোধ্য কোনো শব্দও তিনি ব্যবহার করেননি। ভাষণে কোনো অলঙ্কার ব্যবহার করেননি। নিতান্ত আটপৌরে আমাদের ঘরের শব্দগুলোই তিনি ব্যবহার করেছিলেন। ভাষণের শেষে পিতার মতোই জাতির কাছে ঋদ্ধ মননে বঙ্গবন্ধু অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। তিনি জেনে-বুঝেই বলেছিলেন- ‘এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাহ আল্লাহ’। এই ‘ইনশাহ আল্লাহ’ কথাটির মাহাত্ম্য পবিত্র কুরআন শরীফের ‘সুরা কাহাফ’- এ উল্লেখ।

অর্থাৎ, অঙ্গীকারমূলক কোনো কথা বললে বা অঙ্গীকার করলে ‘ইনশাহ আল্লাহ’ বলা। জাতির পিতা হিসেবে এর চেয়ে বড় অঙ্গীকার আর কী হতে পারে? শেখ মুজিব সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন। ১৮ মিনিটের এই ভাষণ, মিনিটে দুশো-আড়াইশো শব্দের মন্ত্রবাণীর ব্যঞ্জনা, ছন্দ এমন ছিল যে, ভাষণের একটি শব্দ পরিবর্তন করলেই যেন সমস্ত ভাষণটার অঙ্গহানি হতো। সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসী ঐশ্বরিক মহানায়কের অকৃত্রিম নেতৃত্বগুণ, দেশপ্রেমে হৃদয় থেকে উৎসারিত ভাষণের প্রতিটি কথা বাঙালি জাতির হৃদয়ে গেঁথে গিয়েছিল।

কাব্যময় এই ভাষণের জন্যই আন্তর্জাতিক সাময়িকী নিউজউইক তখনই শেখ মুজিবকে অভিহিত করেছে- ‘poet of politics’ বলে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটির শব্দের ব্যবহার বিশ্লেষণ করলে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি থমাস জেফারসনের বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন- ‘The most valuable of all telents is that of never using two words when one will do’. তাই একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণ বাংলা ভাষায় শুধু শ্রেষ্ঠ ভাষণ নয়, পৃথিবীর এক অন্যতম ভাষণ, একটা জাতির মহাকাব্যিক দলিল। এই একটিমাত্র ভাষণেই শেখ মুজিবকে বলা যায় তিনি সেই মহামানব, সময় যাঁকে সৃষ্টি করেনি, যিনি সময়কে নিজের করতলে নিয়ে এসেছেন। যা যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে পথ দেখাবে।
একাত্তরের এই মার্চে স্বাধীনতাকামী বাঙালির চূড়ান্ত আন্দোলনে কর্মসূচির বিভিন্ন ধাপ অতিবাহিত হয়। তন্মধ্যে ২৬ মার্চ শুরুর প্রথম ক্ষণে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা জাতি পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর মুখেই। তবে ৭ মার্চ ভাষণ ছিল মার্চে মুক্তিযুদ্ধপূর্ব সকল ধাপ, পর্যায়ের, নির্দেশনার এক মহাকাব্যিক বাণী। যে বাণীতে সমগ্র জাতি হয়েছিল উদ্দীপ্ত। এই উদ্দীপনায় দেশমাতৃকার টানে বাঙালির মনে ছিল শুধুই জাতির পিতার আদেশ-নির্দেশ, মুখে ছিল জয় বাংলা।

বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার সত্ত্বেও নয় মাসের যুদ্ধে মুক্তিকামী জাতি কখনো দমে যায়নি। পিতার অনুপস্থিতিতে মুক্তি বাসনার দাবানল বিন্দুমাত্র স্তিমিত হয়নি, পিতা বেঁচে আছেন কি না এ প্রশ্নে। শুধু একটা ভাষণের প্রতিটি শব্দই বাঙালির পাথেয়। যা জাতি ভাবত, এমনকি কায়মনোবাক্যে যে, এটা আমাদের পিতার আদেশ। চেতনা এখানে একটাই ছিল– ওই ৭ মার্চ ভাষণের মর্মবাণী।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো মর্মবাণীর এই ভাষণটির জন্য বঙ্গবন্ধুর পূর্ব কোনো দালিলিক প্রস্তুতি ছিল না এটা যেমন সত্য, তাঁর সহধর্মিণী তথা শেখ মুজিবের উত্থানের নিভৃত একক কারিগর বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ৬ মার্চ রাতে ৩২ নম্বরে মুজিবের উদ্বিগ্ন পায়চারিতে কথাটা ছিল- ‘সারা জাতি তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, তোমার যেটা মনে আসে তুমি সেটাই বলো ভাষণে’।

৭ মার্চ ভাষণ বঙ্গবন্ধুর নিজের আত্মচেতনার অভিব্যক্তির সঙ্গে আরেকজনের (বেগম মুজিব) সংশ্লিষ্টতা তথা অনুপ্রেরণার গল্প শুধু এটাই। অন্য কোনো নেতাকর্মী বা কারও নয়। ৭ মার্চ দুপুরে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ সিরাজুল আলম খানসহ ৩২ নম্বরে যান। সিরাজুল আলম খান উৎসাহী ভাবনায় বঙ্গবন্ধুকে বলেন- ‘লিডার আজ স্বাধীনতার ঘোষণা দিতেই হবে’।

তখন বঙ্গবন্ধু তার নাম উচ্চারণ করে ইংরেজিতে বলেন- ‘am the leader of the people. I will lead them. They will not lead me. Go and do your duty’. এতেই বোঝা যায় কত দৃঢ় কঠোর চেতনার নেতা শেখ মুজিব। ৭ মার্চ জনসভা শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিক সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কথা বলেছিলেন-‘You will see history made if the conspirators fail to come to their senses’. কাজেই ৭ মার্চের ভাষণ শেখ মুজিবুর রহমানের সারাজীবনের ত্যাগ, তিতিক্ষা, একাগ্রতার এক ঐশ্বরিক শব্দ চয়নের ব্যাপ্তি।

প্রখ্যাত কলামিস্ট, লেখক প্রয়াত আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীকে একবার বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন– ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’-এর মতো গান আরও লিখতে পারিস না’? তিনি বলেছিলেন- ‘বঙ্গবন্ধু, ৭ মার্চের মতো ভাষণ আপনি আরও দিতে পারেন না’? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘আরে ধুর, এমন ভাষণ কি আর দ্বিতীয়বার দেওয়া যায় নাকি’? এতেই প্রমাণিত ঐশ্বরিক চেতনার বাণী ইচ্ছে করলেই কেউ দিতে পারে না।
রয়টার্স, বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্ট, আনন্দ বাজার পত্রিকা ফলাও করে ছেপেছিল ৭ মার্চের ভাষণে আছে বিপ্লবের রূপরেখা, দেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনা। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ৭ মার্চ ভাষণ নিয়ে উক্তি এবং মর্যাদাসম্পন্ন এক ঘটনাও রয়েছে। ক্যাস্ট্রোর কথা- ‘৭ মার্চের ভাষণ শুধু ভাষণ নয়, এটি একটি রণকৌশলের দলিল’। মর্যাদা আর সম্মানের যে ঘটনা তা হলো, একবার বঙ্গবন্ধু ও ক্যাস্ট্রো মুখোমুখি সাক্ষাতের সময় বঙ্গবন্ধুর পাইপে তামাক ছিল না। ক্যাস্ট্রো তখন কিউবার হাভানা চুরুট গুঁড়া করে বঙ্গবন্ধুর পাইপে দিয়ে নিজে আগুন ধরিয়ে দেন।

অনেকে তখন সমালোচনার দৃষ্টিতে ক্যাস্ট্রোকে বলেছিল- ‘আপনি শেখ মুজিবের তামাকের পাইপে আগুন ধরিয়ে দিলেন কেন’? ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন- ‘আমি শেখ মুজিবের ৭ মার্চ ভাষণের ভিডিও দেখেছি।এ ভাষণ শুনে আমার ইচ্ছে হয়েছিল আমি সুযোগ পেলে শেখ মুজিবের তামাকের পাইপে আগুন ধরিয়ে দিব। এটা সম্মান’। আর বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিরল সম্মানের এক অনুভূতি থেকেই ক্যাস্ট্রো আরও বলেছিলেন- ‘আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি’। উল্লিখিত এসব পর্যালোচনায় ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণ আজ বিশ্বের এক দলিলও।

বাঙালি জাতি হিসেবে গর্বভরে আজ সেটাই অনুধাবন করতে হবে যে, ৭ মার্চের ভাষণ ঐতিহাসিক মূল্যায়নে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড’ রেজিস্ট্রারে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্রের ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ায় এর মাহাত্ম্য অসীম। পরিশেষে বলব, ৭ মার্চ ভাষণের অনন্য তিনটি বৈশিষ্ট্য-১) অলিখিত, ২) তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবে একটি শক্তিশালী উপস্থাপনা এবং ৩) ভাষণের মাঝে মাঝে আঞ্চলিক ও লোকায়ত শব্দের প্রয়োগ।

এ ভাষণ দিয়ে শেখ মুজিব জাতিকে মুক্তির মোহনায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। এই ভাষণ চিরজীবী বাংলাদেশের জন্য চিরন্তন দলিল। এই ভাষণের বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়নেই কেবল বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে। জাতির মুক্তি সংগ্রাম ক্রমপরিণতির রূপ লাভ করবে।
লেখক : উপ-পরিচালক (অব.), গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর

 

আরও পড়ুন