দশেই থমকে গেল সম্ভাবনার জীবন!

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত সাড়ে ১০ বছর বয়সী শেখ রাসেল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের সময় তাদের বিদ্যালয়ের ছাত্ররা ফুল দিয়ে স্বাগত জানাবে, এজন্যই ছিল অপেক্ষা। এর সময় নির্ধারিত ছিল সকাল ১০টা ১০ মিনিট। রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরের এ উপলক্ষে প্রণীত কর্মসূচিতে লেখা ছিল ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ফুল অর্পণ।’ শেখ রাসেলের সে সময়ের গৃহশিক্ষক জানিয়েছেন, তার ছাত্রটি মহাচিন্তায় পড়ে গিয়েছিল, ফুল তো দেবে আব্বাকে। কিন্তু স্যাররা যে বলছেন, মনে রাখবে—তুমি ফুল দেবে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলরকে। সেভাবেই তাকে সম্মান দেখাবে। শেখ রাসেলের ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে অভিভাবক হিসেবে নাম ছিল—পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু ভর্তির পর রাসেল পিতাকে অভিভাবক দিবসে কখনো পায়নি। কারণ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে রাষ্ট্রপতি। কত কাজ তার।

যেদিন প্রথমবারের মতো পিতাকে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাওয়ার কথা ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, সেই অভিশপ্ত দিনে তার মৃত্যু হয় ঘাতকের বুলেটে। বাবা-মা, দুই ভাই, দুই ভাবিসহ আরও অনেককে হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রপতির জন্য যে ফুলের মালাটি তৈরি হয়েছিল, সেটি শুকিয়ে গেল। স্কুলের কাছ দিয়ে চলে গেল ট্যাঙ্ক ও মেশিনগানবাহী গাড়ি। কী বিকট শব্দ! আর রাসেল নিজের স্কুলে হয়ে গেল ম্যুরাল ও দেয়ালের চিত্র। তার স্কুল কামাই হলো। রাসেল স্কুলে যেত ইউনিফর্ম পরে। বই-খাতার ব্যাগ ছিল অন্য সবার মতোই সাধারণ। স্কুল কামাই করেছে, এমনটি কমই ঘটেছে। ‘রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকার’ সময়েই শুধু ছোট্ট শিশুটিকে স্কুলের শ্রেণিকক্ষ কিংবা খেলার মাঠে দেখা যায়নি। সে হয়তো পিতার সঙ্গে জাপান, লন্ডন বা রাশিয়া সফরে গিয়েছে, তাই স্কুলে হাজির হতে পারেনি। বাড়িতে টিচারের কাছে পড়ার টেবিলেও সে নিয়মিত উপস্থিত। আব্বা জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী পদে থাকলেও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি ছিল আশপাশের আর সব বাড়ির মতোই সাধারণ। সেখানে লিফট, এয়ারকন্ডিশন মেশিন, কার্পেট কিংবা সোফাসেট—কিছুই ছিল না। বিদ্যুৎ না থাকলে মায়ের রান্নাঘরে জ্বলত হারিকেন। পড়ার জন্য ফাঁকা ঘর পাওয়াও কঠিন ছিল। সর্বক্ষণ লোকজনের আনাগোনা। কখনো কখনো টিচারকে নিয়ে খাবারের টেবিলেই পড়তে বসত। বাবা-মা সন্তানদের বড় করেছেন এমনভাবে, যেন ন্যায়নীতি অনুসরণ করে। ভালো মানুষ হয়। বড় বোনের স্বামী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া লিখেছেন, ‘১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি নতুন গণভবনে তাদের উঠে যাওয়ার কথা হয়। কিন্তু রাসেলের মা বলেন, সরকারি ভবনের আরাম-আয়েশে প্রতিপালিত হলে ছেলেমেয়েদের মন-মানসিকতা ও আচার-আচরণে অহমিকাবোধ ও উন্নাসিক ধ্যান-ধারণা সৃষ্টি হবে, আত্মীয় ও পাড়া-প্রতিবেশীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।’ [বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা ১৭৪]

তার পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে বাবা, মা ও বড় বোন শেখ হাসিনা নিয়মিত খবর রাখতেন। একবার বাসার টিচার রাসেলকে গৌতম বুদ্ধের জীবনী শুনিয়েছেন। রাসেলের এ মহামানবের কথা শুনে ভালো লাগে। পরদিন বঙ্গবন্ধু শিক্ষকের পড়ার টেবিলে এসে বলেন, তুমি তো আমাকে বিপদে ফেলে দিলে। কাল অনেক রাত পর্যন্ত রাসেল জেগেছিল, আমার ঘরে ফেরা পর্যন্ত। তুমি তাকে গৌতম বুদ্ধের কথা বলেছ। রাসেল আমাকে গৌতম বুদ্ধের মতো হতে বলেছে। এরপর জাতির পিতা পরম মমতায় শিক্ষকের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, রাসেলকে আমরা যোগ্য লোকের হাতেই দিয়েছি। রাসেল স্কুলের পড়া আগেই করে রাখত। এ কারণে স্কুলে বকা খেতে হয়নি। তার ছিল অনেক বন্ধু, তাদের সঙ্গে চকলেট ও টিফিন শেয়ার করত। স্কুলে তাকে নিয়ে যাওয়ার নির্দিষ্ট লোক ছিল না; কিন্তু দুপুরে বাসায় নিয়ে আসার জন্য বেশিরভাগ দিন যেতেন মা ফজিলাতুন নেছা মুজিব। রাসেল একদিন খেলার সময় এক দরিদ্র নারীকে তাদের বাসার সামনে কাঁদতে দেখে। কেন কাঁদছেন, জানতে চায়। উত্তরে মেলে, কাছের এক বাসায় তাকে দিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করানো হয়। এজন্য ১ টাকা দেবে বলেছিল; কিন্তু ২৫ পয়সা দিয়ে বিদায় করেছে। রাসেল তাকে বাসা থেকে এনে খাবার দেয়। আর বসিয়ে রাখে—আব্বা এলে তার কাছে নালিশ দিয়ে আপনার ন্যায্য পাওনা আদায় করে দেব।

এ দরিদ্র নারীর কষ্টে শিশু রাসেলের মন কেঁদে উঠেছিল। তার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সচেষ্ট হয় সে। কিন্তু নিজেই যে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল! ১৫ আগস্ট পরিবারের সদস্যসহ তাকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক খুনিদের বিচার যেন না হয়, সেজন্য কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। আর তা ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে আইনে পরিণত করেছিলেন জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির জাতীয় সংসদ সদস্যরা। এ অপরাধের ক্ষমা নেই।

লেখক: অজয় দাশগুপ্ত,  বীর মুক্তিযোদ্ধা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক
কালবেলা, ১৮ অক্টোবর ২০২৩

আরও পড়ুন