ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এক কঠিন বাস্তবতাকে সামনে রেখে এ বছর তার ৭৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। শুরুতেই বঙ্গবন্ধুসহ যেসব কাণ্ডারি এই দলটির সামনে আসা সব ঝড়ঝাপটা মোকাবেলা করে দলকে বাঁচিয়ে রেখে উপমহাদেশের রাজেনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তাঁদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। দলের ১০ বছর পূর্তির আগেই তিনি ১৯৫৭ সালে দল ছেড়ে নিজে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে আরেকটি দলের জন্ম দিয়েছিলেন।

তিনি ছাড়াও দলের অনেক সিনিয়র নেতা ব্যক্তি বা আদর্শিক স্বার্থে দল ত্যাগ করে অন্য দলে ভিড়েছিলেন বা নিজেরা দল করেছিলেন। সব রকমের বৈরী পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এখনো বাঙালির আশা-ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের চেয়েও পুরনো। আওয়ামী লীগ সৃষ্টির ২৩ বছর পর আওয়ামী লীগের নেতৃতেই ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির সৃষ্টি হয়েছিল।

সেই বাংলাদেশের বয়স এখন ৫৩ বছর। দল হিসেবে যেমন আওয়ামী লীগের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ এসেছে, একইভাবে বাংলাদেশের সামনেও বারবার চ্যালেঞ্জ এসেছে। আওয়ামী লীগ নামের দলটি অবিভক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের একমাত্র দল, যেটি পাকিস্তানের বাঙালিবিরোধী সব অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, দেশে পাকিস্তানের লৌহমানব নামে খ্যাত জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক আইনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছে আর আইয়ুব সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে একটি আন্দোলনের সূত্রপাত, তার সমাপ্তি হয়েছিল ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।
বাঙালির সব আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে জন্ম নিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, তারপর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, যা বর্তমানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ যখন গঠিত হয়, বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে।
পেছনে ফিরে থাকালে এই ৭৫ বছরের আওয়ামী লীগের ইতিহাসই বাঙালি আর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস। এই ইতিহাস নির্মাণ আওয়ামী লীগের জন্য মোটেও সুখের ছিল না। আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ১৩ বছর কেটেছে পাকিস্তানি কারাগারে।

ফাঁসির কাছাকাছি গিয়েছেন দুইবার। প্রথমে ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা মাথায় নিয়ে। পরেরটা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে পেরেছেন। কোনো প্রলোভনের কাছে তিনি পরাজিত হননি। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে পাকিস্তানের প্রথম সেনাশাসক আইয়ুব খানের আমলে। তাঁর ১০ বছর শাসনামলের বেশির ভাগ সময় দলের কেন্দ্রীয় নেতারা কারাগারে কাটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশের প্রথম সেনাশাসক বিএনপি নামের দলটির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া শুধু আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হননি, বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া আর বাঙালির আবেগের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ মুখে নেওয়া ছিল বড় ধরনের অপরাধ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট দলীয় সভায় গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শুধু বঙ্গবন্ধুকন্যাকেই হত্যা করার চেষ্টা করা হয়নি, চেষ্টা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে।
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগআওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই দলের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ নামের এই দেশটি বিশ্বদরবারে একটি পরিচিতি পেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সেই বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশে উত্তরণ ঘটেছিল মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদে দেশ পরিচালনা করছে। নেতৃত্বে আছেন শেখ হাসিনা। এই সময় বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের কাছে উন্নয়নের একটি রোল মডেল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বে একজন স্বীকৃত রাষ্ট্রনায়ক। মানুষের আস্থা এখনো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনার ওপর। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চিন্তা বেশ ভিন্নধর্মী। তারা এখন কেউ আর তাঁর বা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত শত্রু। সামনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন রেখে তারা শুধু আওয়ামী লীগেরই পতন চায় না, শেখ হাসিনাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করতে চায়। তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে, ‘পঁচাত্তের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আর একবার’। বলে শেখ হাসিনাকে কবরে পাঠাতে হবে। এই নির্বোধরা বুঝতে অক্ষম যে আওয়ামী লীগ শুধু কোনো একটি দলের নাম নয়, এটি একটি অনুভূতি, একটি আদর্শ। একে ধ্বংস করা যায় না। আদর্শ আর অনুভূতি চিতাভস্ম থেকে আবার জেগে ওঠে। অতীতে তার প্রমাণ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অনেকবার দিয়েছে।

বলতে দ্বিধা নেই, ৭৪ পূর্ণ করেও আওয়ামী লীগের আগামী দিনের পথচলা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। নির্বাচন সামনে রেখে এই সময় শত্রুর সংখ্যা অসংখ্য। যেদিকে দৃষ্টি যায় সেদিকেই খন্দকার মোশতাকের প্রেতাত্মা। দলের মধ্যে যেমন, তেমনি প্রশাসনেও তাদের সংখ্যা বেড়েছে। সুযোগ খুঁজছে কোন সময় ছোবল মারবে। অনেকের প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছের সব মানুষ কি বিশ্বাসযোগ্য? আগে তো বলা হতো দেশের মধ্যে ষড়যন্ত্রের অর্থায়ন হতো শুধু পাকিস্তানের আইএসআই থেকে। এখন তো বেশ খোলামেলাভাবে জানা যাচ্ছে তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আন্তর্জাতিক আরো অনেক চক্র। দেশের পাশাপাশি লন্ডনে আর ওয়াশিংটনে কাশিমবাজার কুঠি বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ আর শেখ হাসিনা তথা তাঁর সরকারকে বিদায় জানানোর জন্য সবাই এক ছাতার তলে সমবেত হয়েছে। এদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত তো আছেই, আরো আছে বেশ কিছু বামপন্থী। সঙ্গে আছে রাজনীতির মাঠের কিছু এতিম। তারা মাইক পেলে মাঠ গরম করতে পারে; কিন্তু দলের জন্য একজন সমর্থক জোগাড় করতে অক্ষম।

এমন অবস্থায় কী করতে পারেন একজন শেখ হাসিনা? তাঁকে শুধু তাঁর টিম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক হতে হবে। দেখতে হবে কারা দলের মধ্য থেকে উইপোকার ভূমিকা পালন করছে। অনেক তৃণমূল নেতাকর্মী অবহেলার কারণে দূরে সরে গেছেন। তাঁদের ঘরে তুলতে হবে। যারা আওয়ামী লীগে বিভাজন সৃষ্টি করে, কালবিলম্ব না করে তাদের বিদায় করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ সব সময় অপ্রতিরোধ্য। তার বড় প্রমাণ বরিশাল, খুলনা, সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন মেয়র নির্বাচন। বিভাজন গাজীপুর সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশের অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই। তবে সেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর সৃষ্ট আওয়ামী লীগ; যে আওয়ামী লীগের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। যে আওয়ামী লীগের জন্য চার জাতীয় নেতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার। যে আওয়ামী লীগের ডাকে ৩০ লাখ শহীদ স্বাধীনতার বেদিতে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

পর পর তিন মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। এই সময় বলা যায় দলটি এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে যে সাফল্য তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তা অর্জন অসম্ভব নয়। একটু সচেতন হতে হবে। আজকের এই দিনে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করি। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

আবদুল মান্নান
২৩ জুন, ২০২৩

আরও পড়ুন