বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণঃ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমার অনুভূতি

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণঃ প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমার অনুভূতি

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটির তাৎপর্য সম্যকভাবে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে হলে সেই সময়ের প্রেক্ষাপট জানতে হবে। তখন পাকিস্তান নামক যে শাসনযন্ত্রটি ছিল, তার শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন ইত্যাদি সবকিছু সম্পর্কে জানতে হবে। নইলে এই ভাষণের অর্থ ও তাৎপর্য পরিষ্কারভাবে হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হবে না। 

আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব ধরনের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে দেশকে স্বাধীন করেছেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আশা ছিল যে, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে ঐতিহাসিক লাহোর চুক্তির ভিত্তিতে। কিন্তু আমরা দেখলাম, সেই চুক্তির বিষয়গুলো ক্রমেই বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং আমরা আরেকটি ঔপনিবেশিক শাসনের শিকার হচ্ছি। বঙ্গবন্ধু তা বুঝতে পেরে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকেই সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। ধাপে ধাপে আন্দোলন করে এই জায়গাটিতে নিয়ে এসেছিলেন। সংক্ষেপে বললে, ছয় দফা আন্দোলনই আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তিটা তৈরি করে দিয়েছিল। ১৯৫২ আমাদের মুক্তির চেতনার উন্মেষের কাল; বঙ্গবন্ধু সেখান থেকে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হতে ১৯৬৬ সালে যে ছয় দফা আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, সেই আন্দোলনের চূড়ান্ত দৃশ্যই হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

বঙ্গবন্ধু সব সময়ই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। আজকেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জনগণের কথায় বিশ্বাস করেন এবং জনগণের শক্তিতেই চলেন। সমস্ত আন্দোলন-সংগ্রামের শেষে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় হওয়া সত্ত্বেও যখন ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না, তখন বঙ্গবন্ধু অনেক বার আলোচনায় বসেছেন, পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে কথা বলেছেন; তাতেও যখন কোনো কাজ হলো না, তখন স্বাধীনতা ঘোষণা করা ছাড়া তার আর করার কিছু ছিল না। বস্তুত স্বাধীনতাই ছিল তার স্বপ্ন।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছার কথা আমার মনে পড়ে। আমরা আন্দোলন করতাম, আমার দায়িত্বে ছিল ঢাকার তেজগাঁও অঞ্চল। ছাত্রনেতারা প্রতিনিয়ত আমাদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও নির্দেশনা দিতেন। বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি হয়ে কারাগারে থাকতেন, তখন বঙ্গমাতা ছাত্রনেতাদের উত্সাহ জোগাতেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের এক পর্যায়ে আমরা শুনতে পেলাম বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হবে। বঙ্গমাতা বললেন, বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি নেবেন না। আমরা আন্দোলন আরো জোরালো, আরো তীব্র করলাম। ফলে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলো।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ দিতে রেসকোর্স ময়দানের উদ্দেশে রওনা দেবেন, তার আগে বঙ্গমাতা তাকে বলেন, ‘তুমি এতদিন ধরে যা তোমার হৃদয়ে ধারণ করো, তুমি বাঙালি ও বাংলাদেশকে নিয়ে যে স্বপ্নটি দেখছ, আজকে তোমার হৃদয়ের সেই কথাটি বলবে; আর কারো কথা শুনবে না।’

বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্স ময়দানে আসা ও মঞ্চে ওঠার দৃশ্যটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। আমরা তখন ভেবেছিলাম বঙ্গবন্ধু আজই বলে দেবেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন। আমরা অধীর আগ্রহে বসেছিলাম। আমরা ঢাকার ও সমগ্র বাংলাদেশের মানুষই সেই অপেক্ষায় ছিলাম। আমি আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধু সব সময়ই শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। সব দ্বার যখন বন্ধ হয়ে গেল, কেবল তখনই তিনি স্বাধীনতা ও যুদ্ধের কথা বললেন।

বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে মঞ্চে উঠলেন। মঞ্চটি ছিল বেশ উঁচু। তিনি যখন ভাষণ শুরু করতে যাচ্ছিলেন, তখন অনেকেই তার কানে কানে কথা বললেন, কেউ কেউ তার হাতে কাগজের স্লিপ দিলেন। তিনি চশমা খুলে স্লিপগুলো চশমার নিচে রাখলেন এবং সেই কালজয়ী ভাষণ শুরু করলেন।

তার সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দ ছিল ঐতিহাসিক এবং অর্থপূর্ণ। প্রথমে তিনি বললেন, আমরা কী অন্যায় করেছি? দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কথা সংক্ষেপে তুলে ধরলেন। তারপর বললেন, পাকিস্তানিদের হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে। তারপর উচ্চারণ করলেন সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা :‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

তিনি এখানেই সবকিছু বলে দিয়ে গেছেন, স্বাধীনতাসংগ্রামের কথা বলে দিয়ে গেছেন :‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’  বলে দিয়ে গেছেন যুদ্ধ শুরু হলো, আবার যুদ্ধ শুরু হয়নি। তিনি আরেকটু অপেক্ষা করছিলেন বিশ্বজনমত যেন যুদ্ধের সময়ও বাংলাদেশের পক্ষে থাকে। ক্যান্টনমেন্টের পাশেই ছিল আমার বাড়ি। আমরা সেই ভয়াবহতা দেখেছি, ছোট অস্ত্র, মাঝারি অস্ত্র, বড় অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানিরা কীভাবে গোলাগুলি করেছিল সেসব দৃশ্য আমরা দেখেছি। কাজেই কী হতে পারত বাংলাদেশের বা কতখানি ক্ষতি হতো, তা আঁচ করতে পেরেই বঙ্গবন্ধু আমাদের ধাপে ধাপে সেই জায়গাটিতে নিয়ে গিয়েছেন। আমাদের সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন। ২৬ মার্চ তিনি ঘোষণা দিলেন, যুদ্ধ শুরু এবং আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।

স্বাধীনতার জন্যই তো আমরা তৈরি হচ্ছিলাম। আমাদের স্বপ্নই ছিল আমরা আর পাকিস্তানের শাসনে থাকব না। প্রয়োজনে যুদ্ধ করব। আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, আমি তখন ঢাকা শহরের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়াতাম। তখন আমরা ছাত্ররা একত্রিত হয়ে (ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও আরো কয়েকটি ছাত্রসংগঠন) সবাইকে বিভিন্নভাবে স্বাধীনতার জন্য তৈরি হতে বলছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিটা শব্দই যে অর্থবহ ছিল তা আমি সব সময়ই বলে এসেছি। বাংলাদেশের তরুণ-যুবকেরা বর্তমানে এই ভাষণ নিয়ে গবেষণা করছেন। এটা একটা গবেষণার বিষয়ই বটে; তার এই ভাষণ সম্পর্কে নিউজ উইক ম্যাগাজিন বলেছে, বঙ্গবন্ধু একজন রাজনৈতিক কবি; ইউনেসকো ভাষণটি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষণ করেছে।

আমরা বাংলাদেশ নামটি শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। সেদিন আমরা স্বাধীনতা ঘোষণার অপেক্ষাতেই ছিলাম। তখন মনে করেছিলাম বঙ্গবন্ধু হয়তো এখনই বলবেন, আর এখনই যুদ্ধ লেগে যাবে। কিন্তু তখন যুদ্ধ লাগলে কী হতো তাও তিনি চিন্তা করেছিলেন। সেজন্য আরো কিছু সময় নিয়েছিলেন, ২৬ মার্চ (২৫ মার্চ রাত বারোটার পরে) তিনি স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায়শই আমাদের বলতেন, পাকিস্তানের জেলখানায় তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তো আমাকে মেরে ফেলবে। তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ, তোমরা আমার মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছে দিয়ো।’

এই বাংলাদেশ ও বাঙালির প্রতি যে তার গভীর ভালোবাসা ছিল, তার প্রমাণ তিনি বারবার দিয়ে গেছেন। স্বাধীনতার পরে তিনি বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ ছাড়া আর কিছুই চিন্তা করতেন না। কীভাবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন? কীভাবে বাংলাদেশকে পাকিস্তানিদের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠিয়ে আনবেন? এসবই ছিল তার মূল ব্রত। তিনি যে রূপরেখা তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন, যেভাবে চলতে চেয়েছিলেন এবং যেভাবে পরিকল্পনাগুলো করে গিয়েছিলেন, বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেগুলোই অনুসরণ করছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, যার ধমনিতে জাতির পিতার রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তিনি আমাদের প্রায়ই বলেন, ‘জাতির পিতা যে যে স্বপ্ন দেখে গিয়েছিলেন, সেগুলোই আমি একটি একটি করে বাস্তবায়ন করছি।’ আজ তিনি সেসব বাস্তবায়ন করতে পারছেন বলেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ আজ সব দিক থেকেই সফল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, পাশাপাশি পাকিস্তানে কী হচ্ছে তা-ও সবাই দেখছেন। আসলে এটিই হলো নেতৃত্বের গুণ।

বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সমালোচকেরা কখনোই চায়নি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পাক। এই সমালোচকরা সব সময়ই পাকিস্তানকে আরো শক্তিশালী করবে কিংবা পাকিস্তানের ছত্রছায়ায় থাকতে চাইবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এটা তারা কোনো দিনই চিন্তা করে না। সেজন্যই তারা সমালোচনা করে, যে সমালোচনার কোনো অর্থ হয় না, কোনো যুক্তি নেই বা সেই সমালোচনার কোনো ঐতিহাসিক দলিল তারা উত্থাপন করতে পারে না।

আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছি, এ কথা আমরা বলব; আমরা দেশের কথা বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা বলব, বঙ্গবন্ধুর কথা বলব। বঙ্গবন্ধু যে নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছিলেন আমরা তাই অনুসরণ করছি বলেই আমরা আজ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি।

বঙ্গবন্ধু আলোর মশাল জ্বালিয়ে বাংলাদেশকে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন। সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমে যে দেশ স্বাধীন করা যায় তা দেখিয়ে গিয়েছেন। সত্সাহস থাকলে দেশের সব জনতাকে যে একত্রিত করে কথা বলা যায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন। কাজেই আমি মনে করি, বিশ্বমানের নেতৃত্ব থাকলে, সত্ উদ্দেশ্য থাকলে, দেশপ্রেম থাকলে সবকিছুরই উত্তরণ ঘটানো যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তা করে দেখিয়ে গেছেন।

লেখক : আসাদুজ্জামান খান কামাল
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৩

আরও পড়ুন