লক্ষ্য স্বাধীনতা: বঙ্গবন্ধুর অনন্য অসহযোগ আন্দোলন

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

একটি ছোট বাক্য, একটি ঘোষণা- কিন্তু তাৎপর্য অপরিসীম। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ-এর অভ্যুদয়ের জন্য চূড়ান্ত সংগ্রাম শুরুর সংকেত হয়ে ওঠে তা। মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান পরিণত হয় বাংলাদেশে। শহর-বন্দর-গ্রাম, সর্বত্র ছাত্র-জনতা নেমে আসে রাজপথে। কণ্ঠে অভিন্ন স্লোগান- বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।

পাকিস্তান ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ নিরঙ্কুশ রায় প্রদান করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে। তিনি নির্বাচনে এ ভূখণ্ডের জনগণের রায় চেয়েছেন স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফা ইস্যুতে। একাধিক ঘরোয়া আলোচনায় তিনি এটাও বলেছেন- ছয় দফা না মানলে এক দফা।

এক দফা কী তার কাছে সেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্পষ্ট ছিল। পূর্ব পাকিস্তানে সে সময় বসবাস করত পাকিস্তানের ৫৬ ভাগ মানুষ। কিন্তু রাজধানী, সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদর দপ্তর, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দপ্তরসহ কেন্দ্রীয় সরকারের সব বিভাগ ও দপ্তরের হেড অফিস স্থাপিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তানের জাতীয় বাজেটের অর্ধেকের বেশি ব্যয় হতো প্রতিরক্ষা খাতে। আর এই ব্যয়ের ৯০ ভাগের বেশি ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার ও জওয়ানদের সিংহভাগ নিয়োগ প্রদান করা হতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে।

বঙ্গবন্ধু এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে সচেতন, ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করেছিলেন। অধিকার আদায়ের জন্য চাই সুসংহত রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগই ছিল এর মূর্ত রূপ।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গণরায় পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী বাস্তবায়ন করবে না, এমন আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয় ১৯৭১ সালের ১ মার্চ মধ্যাহ্নে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পক্ষ থেকে দুপুরে বেতারের এক ঘোষণায় বলা হয়- ‘৩ মার্চ ঢাকায় নির্ধারিত জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।’

একটি ছোট বাক্য, একটি ঘোষণা- কিন্তু তাৎপর্য অপরিসীম। স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ-এর অভ্যুদয়ের জন্য চূড়ান্ত সংগ্রাম শুরুর সংকেত হয়ে ওঠে তা। মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান পরিণত হয় বাংলাদেশে। শহর-বন্দর-গ্রাম, সর্বত্র ছাত্র-জনতা নেমে আসে রাজপথে। কণ্ঠে অভিন্ন স্লোগান- বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।

বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা ছিল আগে থেকেই। বার বার তিনি বলছিলেন- ‘কেউ দাবায়ে’ রাখতে পারবে না। জনগণ সেটা কেবল কথার কথা হিসেবে নেয়নি।

১ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামে সেদিন পাকিস্তান একাদশের সঙ্গে ক্রিকেট খেলা চলছিল আন্তর্জাতিক একাদশের। সন্দেহ নেই যে, দর্শকরা পাকিস্তানের জয় দেখতে মাঠে গিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত হওয়ার খবর জেনে গ্যালারিতে শুরু হয় বিক্ষোভ, পাকিস্তানের সমর্থকরা মুহূর্তে বাংলাদেশের সমর্থকে পরিণত হয়। তারা রাজপথে নেমে আসে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে।

১ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইকবাল হলের ছাত্ররা ছাত্রাবাসের নতুন নাম দেয়- শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলের নাম হয় সূর্যসেন হল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তখন সশস্ত্র পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। নতুন নায়ক কুখ্যাত আগরতলার মামলায় অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক (১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয়) এবং বীর চট্টগ্রামের মাস্টারদা সূর্যসেন।

২ মার্চ ঐতিহাসিক বটতলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ উত্তোলন করেন লাল-সবুজ-সোনালি রঙের জাতীয় পতাকা। পরদিন পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে ঘোষণা করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার। যে ছাত্রলীগ তিনি ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা ইতিহাসের দাবি পূরণ করতে পারে। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে তারা সাড়া দেয়। জনগণও এগিয়ে আসে।

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন- “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তিনি জনগণকে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেন।

তিনি ঘোষণা করেন পাকিস্তানি প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি। এমন সফল আন্দোলন বিশ্বে নজিরবিহীন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান খান লিখেছেন- “শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন বিশ্বের একমাত্র নেতা যিনি অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি লোকের জন্য একটি ডি-ফ্যাক্টো বা কার্যত সরকার গঠন করেছিলেন। একটি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে জনসমর্থন সংগঠিত করায় শেখ মুজিবের অনন্য ভূমিকা বিশ্বে সপ্তম জনবহুল রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটায়।” (সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ১৩)

অসহযোগ আন্দোলনের সময় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি পরিণত হয় বিকল্প সরকারের কেন্দ্রে। বঙ্গবন্ধু যা বলেছেন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ সেটাই অনুসরণ করেছে। সংবাদপত্র এবং বেতার-টেলিভিশন সামরিক কর্তৃপক্ষের নয়, মেনে চলেছে ‘৩২ নম্বরের’ নির্দেশনা। আদালতের বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন শৃঙ্খল বাহিনীর কর্মী- সবাই সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ উপেক্ষা করে। গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরাও নির্দেশনার জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে নয়, যেত ৩২ নম্বরে।

ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা নির্দেশনা নেয় বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি তাকে শপথপাঠ করাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকরাও অনুসরণ করেন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা।

৭ মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনীকে মোকাবিলা করার লক্ষ্য সামনে রেখে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ। গেরিলা যুদ্ধের নানা কৌশলও তারা আয়ত্ত করতে থাকে। ছাত্রীরাও মিলিটারি ট্রেনিং নিতে থাকে।

এ যেন অন্য এক বাংলাদেশ। সর্বত্র নতুন জাগরণ। স্বাধীনতা আসবেই, নিশ্চিত হয়ে যায়। পাকিস্তানের সৈন্যরা হানাদার বাহিনী হিসেবে গণ্য হয়।

২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আহ্বান জানায়- সব আবাসিক বাড়িঘর এবং সরকারি ও আধাসরকারি অফিসে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করতে হবে। এ নির্দেশনা কীভাবে পালিত হয়েছিল তার বিবরণ রয়েছে সিদ্দিক সালেকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে। সে সময়ে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

তিনি লিখেছেন- ‘প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান তখন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকায়। ২৩ মার্চের সূর্যোদয়- ঐতিহাসিক পাকিস্তান দিবস। ১৯৪০ সালে এদিন লাহোর প্রস্তাব পাস হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ আওয়ামী লীগ দিনটিকে প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়।

‘তারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি প্রদর্শন করে। রেডিও ও টেলিভিশনে নতুন জাতীয় সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’… বাজানো হয়। শেখ মুজিব তার বাসভবনে ছাত্রদের একটি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান, তার বাড়ির ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করতে দেন এবং সমবেত ছাত্রদের সামরিক কায়দায় সালাম গ্রহণ করেন। এটাই ছিল ডি-ফ্যাক্টো প্রেসিডেন্ট হাউস।

‘গোটা ঢাকা শহর বাংলাদেশের পতাকায় ছেয়ে যায়। পাকিস্তানের পতাকা ওড়ে কেবল দুটি স্থানে- গভর্নমেন্ট হাউস ও সামরিক সদর দফতর। বাঙালি তরুণরা শহরের সড়কগুলোতে জয় বাংলা ধ্বনিসহ প্রদক্ষিণ করে। তাদের জন্য এটি ছিল প্রকৃত স্বাধীনতা দিবস।’ (উইটনেস টু সারেন্ডার, পৃষ্ঠা ৬৭-৬৮)

বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া ছিল কতটা সর্বাত্মক, টেলিভিশনের এ ঘটনা তার সাক্ষ্য হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে এ ভূখণ্ড ক্যান্টনমেন্টের নির্দেশে নয়- পরিচালিত হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর। তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা অবশ্য বর্তমান রাজউক ভবনে টেলিভিশন কেন্দ্রটি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। শিল্পী-কলাকুশলীরা প্রায় সবাই বাঙালি। তারা কাজ করছিলেন মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে। প্রতি রাতে অনুষ্ঠান শেষে অবশ্য পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত বাজানো হতো এবং পতাকা প্রদর্শন করা হতো।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ বাংলাদেশের সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানায়। এ দিনটি পাকিস্তান দিবস হিসেবে পালিত হতো। টেলিভিশনে খ্যাতিমান শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার অনুষ্ঠান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতেন। মার্চের প্রথম থেকেই টেলিভিশনে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন হচ্ছিল। ২৩ মার্চ মোস্তফা মনোয়ার জানান, এ দিন অনুষ্ঠান শেষে পাকিস্তানের পতাকা দেখানো হবে না। তবে পাকিস্তানের সৈন্যদের বোকা বানাতে হবে। অনুষ্ঠানের নিয়মিত ঘোষক মাসুমা খাতুনের কাছে জানতে চান- স্বাভাবিক সময়ের পরও ঘণ্টা দুয়েক টেলিভিশন কেন্দ্রে থাকতে পারবেন কি না। মাসুমা খাতুন গৌরবের এক মুহূর্তের সাক্ষী হতে উৎসাহের সঙ্গে রাত ১২টার পরও থাকতে রাজি হয়ে যান।

২৩ মার্চ নির্ধারিত সময়ের পরও দেশাত্মবোধক গান শোনানো হতে থাকে টেলিভিশনে। পাকিস্তান আর্মির অফিসাররা কিছু সময় পর পর এসে জানতে চায়- কেন এত রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলছে। তাদের বলা হয়- আজ পাকিস্তান দিবস, স্পেশল ডে। তাই অতিরিক্ত সময় অনুষ্ঠান চালানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। উপস্থিত সবাই শিহরিত। মাসুমা খাতুন মাইক্রোফোনে বলেন- ‘এখন রাত ১২ টা ২ মিনিট। আজ ২৪ মার্চ। আমাদের অনুষ্ঠান এখানেই শেষ।’

২৩ মার্চ পাকিস্তান টেলিভিশন, ঢাকা কেন্দ্রে পাকিস্তানের পতাকা দেখায়নি। পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতও বাজেনি।

১৭ মর্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। ১০২ বছর পূর্ণ হলো তার। যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র তিনি প্রতিষ্ঠান করেছেন, তা পূর্ণ করল ৫১ বছর। জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

অজয় দাশগুপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

নিউজ বাংলা ২৪  ১৭ মার্চ, ২০২২

আরও পড়ুন