বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব ও প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন ভাবনা

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

গত ২৮ সেপ্টেম্বর পঁচাত্তরে পা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নশ্বর এই পৃথিবীতে জীবনের এই দৈর্ঘ্যটি ছুঁতে পারাটা নিঃসন্দেহে একটি অর্জন। সেই বিবেচনাতেই এবারের দিনটির গুরুত্ব ছিল অন্যরকম। তার উপর জন্মদিনটা যেহেতু শেখ হাসিনার, যিনি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক- সকল মাপকাঠিতেই উত্তীর্ণ। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একজন জননন্দিত জননেতা হিসেবে সফলভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। এমনকি করোনাকালেও বাঙালী জাতিকে ঈর্ষণীয় নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। কাজেই তার পঁচাত্তরে যে জাতি আনন্দে ভাসবে আর দেশে তার শারীরিক অনুপস্থিতিতেও আনন্দের জোয়ার বয়ে যাবে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, সম্প্রীতি বাংলাদেশের অফিস থেকে গ্রামের কৃষকের ফসলের মাঠ পর্যন্ত, সেটা বলাই বাহুল্য। এই সময় নানাভাবে তাকে মূল্যায়ন করা হবে। উঠে আসবে তার নানা অর্জন। বিশ্বের অন্যতম সৎ সরকার প্রধানের স্বীকৃতি থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে এসডিজি পদক অর্জন, কিংবা বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করা থেকে শুরু করে করোনাকালে আমাদের ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন, বাদ যাবে না এসবের কোন কিছুই। যেমন বাদ যাবে না বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প, ঢাকার মেট্রোরেল, কর্ণফুলীর টানেল, আশ্রয়ণ প্রকল্প কিংবা পদ্মা সেতুর মতো আরও অসংখ্য অর্জন। একজন শেখ হাসিনার এত শত অর্জনের তালিকাটি এত বিস্তৃত যে তার একান্ত সমর্থকও এই তালিকার সব অর্জন মনে করে লিখতে বা বলতে পারবেন না। অতএব সেই চেষ্টাটাও করব না।

স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা ধরে রাখা যেমন ঢের বেশি শক্ত কাজ, ঠিক তেমনিভাবে উন্নত হওয়া আর উন্নয়নকে একটা টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো বেশি কঠিন। দু’শ’ বছরের গণতান্ত্রিক ইতিহাস নিয়ে যাদের এত গর্ব, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরের শুরুতে গণতন্ত্রের ভাগার যাত্রার সাক্ষী গোটা বিশ্ব। একদল অসুস্থ সাদা মানুষ কিভাবে মার্কিন গণতন্ত্রের পাদপিঠ ওয়াশিংটনের ক্যাপিটলকে উন্মত্ত বর্বরতায় লাঞ্ছিত করল তা দেখে সাত সাগর আর তেরো নদীর এপারে বসে রাত জেগে শিউরে উঠেছি এমনকি আমরাও। আর ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অর্থ ব্যয়ে উন্নয়ন আর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আধুনিকতম সমরসজ্জাও যে কত ঠুনকো তার সর্বশেষ নজির তো গোটা বিশ্ব দেখল আমাদের ঘরের পাশে আফগানিস্তানে এই কদিন আগেই।

গণতন্ত্র আর উন্নয়নকে টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে প্রয়োজন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আর আদর্শিক মুক্তি নিশ্চিত করা। আমার দৃষ্টিতে এই জায়গাটাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্জন আর পাশাপাশি চ্যালেঞ্জটাও সবচাইতে বেশি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এই ভূখণ্ডে অসাম্প্রদায়িকতার হাজার বছরের ঐতিহ্য যেমন বাস্তবতা, তেমনি এর বিপরীতে সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই রাষ্ট্রের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানও একই রকম সত্য। ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গ কিংবা পাকিস্তানীদের হাতে নিষিদ্ধ রবীন্দ্রচর্চা আর নজরুলের ইসলামীকরণ এই উক্তির পক্ষে মোটা দাগের গুটিকয়েক উদাহরণ মাত্র। এর ব্যত্যয় ঘটেনি এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর উর্দিপরা সরকারগুলোতো বটেই, উর্দি ছেড়ে গণতন্ত্রের লেবাস ধারণ করা বিএনপি আর জাতীয় পার্টির সরকারগুলোও এই অপরাধে কেউ কারও চেয়ে কম অপরাধী নয়।

সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একজন শেখ হাসিনা উল্টো ¯্রােতে নৌকা ভাসিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকরী আর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে তিনি এদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজটি সুসম্পন্ন করেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন, এদেশে একদিন না একদিন তার বিচার হবেই। এবার এরই ধারাবাহিকতায় তিনি দ্বিতীয় বলিষ্ঠ পদক্ষেপটি নিতে উদ্যোগী হয়েছেন। এবারের আগস্টে একাধিকবার তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে বিচারের আওতায় আনা হবে পঁচাত্তরের নেপথ্যের কুশীলবদেরও। ছাড় পাবেন না এমনকি আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়রাও যাদের ভূমিকা সেদিন ছিল রহস্যময় কিংবা যারা সেদিন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। নিজ দলের দোষীদের আইনের আওতায় আনার এমন অনন্য নজির এর আগে বাংলাদেশে একজনই স্থাপন করেছিলেন আর তিনি হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শুধু যে উন্নয়নের মহাসড়কেরই সঠিক পথে আজ ধাবমান বাংলাদেশ তা-ই নয়, বরং যা পরম স্বস্তিদায়ক তা হলো, প্রধানমন্ত্রী আমাদের এই উন্নয়নটাকে ধারাবাহিক এবং সুসংহত করার জায়গাটাতেও হাত দিয়েছেন। আমার চিন্তার যে ক্ষুদ্র পরিসর তাতে আমি একটা কথাই বুঝি, আমরা যদি এখন শুধু স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার সপক্ষীয়দের শাসনটুকু নিশ্চিত করে যেতে পারি তাহলেই পরম নিরাপদে থাকবে আগামীর বাংলাদেশ। এ কাজটি করার দিকনির্দেশনাও দিয়ে গেছেন জাতির জনক। জাতির পিতার অসম্পূর্ণ যে দ্বিতীয় বিপ্লব, তার অন্তর্নিহিত স্পিরিট ছিল এটাই। বাকশাল কখনই একদলীয় শাসন ছিল না বরং সেটি ছিল স্বাধীনতার সপক্ষীয়, দল-মত নির্বিশেষে সবার একটি কমন প্ল্যাটফর্ম। বাকশালের অধীনে যে নির্বাচনী ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল সেখানে যিনিই জিতুক বা হারুক না কেন, তিনি হতেন স্বাধীনতার সপক্ষীয় একজন। একাত্তরে যারা এদেশ চায়নি বাকশালের অধীনে দেশ পরিচালনার ধারে কাছেও ঘেঁষার কোন সুযোগ তাদের ছিল না। আর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দেশের দায়িত্ব পেয়ে এরাই প্রকারন্তরে প্রমাণ করেছে, বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কতটা সময় ও বাংলাদেশ উপযোগী কনসেপ্ট ছিল।

আজকের পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাকশালের হুবহু বাস্তবায়ন যে সম্ভব না তা যে কোন বোকাও বুঝবে। বাকশালের মূল এসেন্সকে ধারণ করে যদি আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে আমাদের জাতীয় সংসদে যে আজ থেকে দেড়শ’ বছর পরে মার্কিন ক্যাপিটলের মতো কোন দৃশ্যপটের অবতারণা হবে না, তা কিন্তু কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না। সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে এই আটাশে একটাই প্রার্থনা, স্রষ্টা প্রধানমন্ত্রী যেন বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত দ্বিতীয় বিপ্লব সুসম্পন্ন করার জন্য শতায়ু প্রদান করেন।

অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
জনকণ্ঠ সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২১ লিঙ্ক

আরও পড়ুন