সায়মা ওয়াজেদ পুতুল : কল্যাণমন্ত্রে নিষ্ঠ ব্রতচারী

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার সব সুযোগই ছিল তাঁর। যে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের পরম্পরা তিনি, তাতে উত্তাল করতালিমুখর দিবস-রজনী তাঁর অধরা থাকার কথাও নয়। তিনি সেই পথে গেলেন না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘অর্থভাণ্ডারে মূল্যবান সামগ্রী লইয়া মানুষ গর্ব করে। কিন্তু তাহার চেয়ে বড়ো কথা স্মৃতিভাণ্ডারের সম্পদ। সেই মানুষই একান্ত দরিদ্র যাহার স্মৃতিসঞ্চয়ের মধ্যে অক্ষয় গৌরবের ধন বেশি কিছু নাই।’ তিনি কবিগুরু কথিত সেই ‘স্মৃতিভাণ্ডারের সম্পদ’ আঁকড়ে ধরে ‘অক্ষয় গৌরবের’ অন্য এক জীবন বেছে নিয়েছেন। যেমনটি পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরুর স্ত্রী কমলা নেহরু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘…সকলের চেয়ে বড়ো তাঁর সুদৃঢ় সত্যনিষ্ঠা। পলিটিক্সের সাধনায় আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে তিনি নিজেকে কখনো হারিয়ে ফেলেননি। সত্য যেখানে বিপজ্জনক, সেখানে সত্যকে তিনি ভয় করেননি; মিথ্যা যেখানে সুবিধাজনক, সেখানে তিনি সহায় করেননি মিথ্যাকে। মিথ্যার উপচার আশু প্রয়োজনবোধে দেশপূজার যে অর্ঘ্যে অসংকোচে স্বীকৃত হয়ে থাকে, সেখানে তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন।’ এই জীবনই তিনি শ্রেয় মনে করেছেন।

সামাজিক জীব বলেই মানুষ নির্ভরতা চায়। চায় যাপিত জীবনের নির্ভার নিশ্চয়তা। অন্যদিকে কল্যাণমন্ত্রে যাঁর দীক্ষা, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মানুষের ধর্ম’ যিনি ধারণ করেন হৃদয়ে, জনগণের সেবা যাঁর ব্রত, তিনিই তো অমৃতের সন্তান। কল্যাণমন্ত্র বা কল্যাণব্রতে দীক্ষা তিনি পেয়েছেন তাঁর পরিবার থেকেই। কী পরিচয় তাঁর? তিনি সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর মাতামহ। তিনি বাংলাদেশের চতুর্থবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা। তাঁর বাবা বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া। অথচ আপন বলয়ে তিনি নিজেকে গড়েছেন সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। প্রচার এড়িয়ে চলেন সযত্নে। রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়েও রাজনীতি থেকে নিজেকে সব সময় সরিয়ে রেখেছেন তিনি।

সামাজিক জীব বলেই মানুষ নির্ভরতা চায়। চায় যাপিত জীবনের নির্ভার নিশ্চয়তা। অন্যদিকে কল্যাণমন্ত্রে যাঁর দীক্ষা, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘মানুষের ধর্ম’ যিনি ধারণ করেন হৃদয়ে, জনগণের সেবা যাঁর ব্রত, তিনিই তো অমৃতের সন্তান। কল্যাণমন্ত্র বা কল্যাণব্রতে দীক্ষা তিনি পেয়েছেন তাঁর পরিবার থেকেই। কী পরিচয় তাঁর? তিনি সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর মাতামহ

বিশ্বসংসারে এমন আড়ালচারী কিছু মানুষের সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা নিভৃতে কাজ করেন দেশ ও মানুষের কল্যাণে। ব্যক্তিগত মোহের ঊর্ধ্বে উঠে দেশচিন্তায় শুধু নয়, নিজেকে নিয়োজিত রাখেন বিশ্বমানবের কল্যাণে। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল নিজেকে নিয়ে ভাবিত হতে না পারার বিরল শক্তি তিনি অর্জন করেছেন। পাদপ্রদীপের আলোয় নিজেকে আলোকিত করার সব সুযোগ ও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এখন অবধি নিজেকে রেখেছেন মোহমুক্ত। যাঁরা পারিবারিকভাবে নিতান্ত সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত, রাজনৈতিক আবহে বেড়ে ওঠার পরও এমন নিভৃত জীবন কাটানো তাঁদের পক্ষে সম্ভব। ক্ষমতা কখনো তাঁর মোহভঙ্গ করতে পারেনি। তাঁর জীবনাচার লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন। আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। সত্যকে তিনি ভয় করেননি। মিথ্যার সুবিধা ভোগে প্রবৃত্ত হননি কোনো দিন।

‘মানুষের ধর্ম’ নিবন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মানুষের দায় মহামানবের দায়, কোথাও তার সীমা নেই। অন্তহীন সাধনার ক্ষেত্রে তার বাস। জন্তুদের বাস ভূমণ্ডলে, মানুষের বাস সেইখানে, যাকে সে বলে তার দেশ। দেশ কেবল ভৌমিক নয়, দেশ মানসিক। মানুষে মানুষে মিলিয়ে এই দেশ জ্ঞানে জ্ঞানে, কর্মে কর্মে। যুগযুগান্তরের প্রবাহিত চিন্তাধারায় প্রীতিধারায় দেশের মন ফলে শস্যে সমৃদ্ধ। বহু লোকের আত্মত্যাগে দেশের গৌরব সমুজ্জ্বল। যে দেশবাসী অতীতকালের তাঁরা বস্তুত বাস করতেন ভবিষ্যতে। তাঁদের ইচ্ছার গতি, কর্মের গতি ছিল আগামীকালের অভিমুখে। তাঁদের তপস্যার ভবিষ্যৎ আজ বর্তমান হয়েছে আমাদের মধ্যে, কিন্তু আবদ্ধ হয়নি। আবার আমরাও দেশের ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে উৎসর্গ করছি। সেই ভবিষ্যেক ব্যক্তিগতরূপে আমরা ভোগ করব না। যে তপস্বীরা অন্তহীন ভবিষ্যতে বাস করতেন, ভবিষ্যতে যাঁদের আনন্দ, যাঁদের আশা, যাঁদের গৌরব, মানুষের সভ্যতা তাঁদেরই রচনা।’

প্রখ্যাত অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অটিস্টিক শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একজন সদস্য। ১৯৯৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল মনস্তত্ত্বে স্নাতকোত্তর। ২০০৪ সালে স্কুল মনস্তত্ত্বে বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। এ বিষয়ে তাঁর গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত হয়। তিনি ২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম ও স্নায়বিক জটিলতা সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজ করছেন। স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব সংস্থা ২০০৪ সালে তাঁকে হু এক্সিলেন্স পুরস্কারে ভূষিত করে। ২০১৩ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষজ্ঞ পরামর্শক তিনি। বাংলাদেশের অটিজমবিষয়ক জাতীয় কমিটির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ২০১৯ সালে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সৃষ্টিশীল নারী নেতৃত্বের ১০০ জনের তালিকায় স্থান করে নেন নিজ যোগ্যতাগুণে। তাঁর উদ্যোগেই ২০১১ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো অটিজমের মতো অবহেলিত একটি বিষয় নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভারতের কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী অংশগ্রহণ করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশে ‘নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅ্যাবিলিটি ট্রাস্ট অ্যাক্ট ২০১৩’ পাস হয়।

কবিগুরুর ভাষায় তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বলি, ‘…এল মহাজন্মের লগ্ন।/আজি অমারাত্রির দুর্গতোরণ যত ধূলিতলে হয়ে গেল ভগ্ন।/ উদয়শিখরে জাগে মাভৈঃ মাভৈঃ রব/নবজীবনের আশ্বাসে…।’

লেখক : আলী হাবিব, সাংবাদিক

১০ জানুয়ারি, ২০২১ ১৫:৩০ | সূত্র: নিউজপেপার ৭১ লিঙ্ক

আরও পড়ুন