বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়মুক্তি দিল কে?

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

হত্যাকাণ্ডের পৈশাচিকতা থেকে এ-ও প্রমাণিত যে, এই ঘটনার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রতিশোধস্পৃহা। সে প্রতিশোধস্পৃহা ছিল একাধারে রাজনৈতিক-ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, তার দিক-নির্দেশক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গঠনের সবরকম উদ্যোগের বিরুদ্ধে।

অবসরপ্রাপ্ত এক বয়োজ্যেষ্ঠ মার্কিন কূটনীতিক চার্লস স্টুয়ার্ট কেনেডি যিনি এখন ভার্জিনিয়ায় অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিপ্লোমেটিক স্টাডিজ অ্যান্ড ট্রেনিং-এর ফরেন অ্যাফেয়ার্স ওরাল হিস্ট্রি প্রকল্পের পরিচালক; তিনি ১৯৮৯ সালের ২০ অক্টোবর ৭৪-৭৬ সালে বাংলাদেশে কর্মরত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজেন বোস্টারের একটি সাক্ষাৎকার নেন। এই সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে আজকের এই রচনা যেখানে রাষ্ট্রদূত বোস্টার বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন-

“তিনি ছিলেন খুবই এক ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব, দুর্দান্ত মানুষ। আপনি কেবল এই ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে তাৎক্ষণিকভাবেই তাঁকে পছন্দ করবেন।”

বঙ্গবন্ধুর জীবন-যাপন সম্পর্কেও বোস্টার উল্লেখ করেন তার সব প্রশংসনীয় মত-

“যে বাড়িটিতে তিনি থাকতেন সেটি ছিল খুব সাধারণ একটি বাড়ি, কোন একটি দেশের রাষ্ট্রপতির বসবাসের জন্যে যথাযথ নয়। কিন্তু তিনি দেশের পিতার মতো ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ছিলেন অনেকটা জর্জ ওয়াশিংটনের মতো, যিনি তাঁর দেশকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেছেন তবে রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা তাঁর তেমন ছিল না!” বোস্টারের মতে- “শেখ মুজিবের চেয়ে জিয়া প্রশাসক হিসেবে দক্ষ বলে বলে তাঁর কাছে মনে হয়েছে ও সেরকম কাউকেই তখন দরকার ছিল।” (Someone with more managerial talent was required. They had that talent in Zia who eventually succeeded him)!

এই যে ‘মুখে এক মনে আর এক’ চরিত্রের তৎকালীন মার্কিন কূটনীতিক, বোস্টার হলেন তার এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ। বঙ্গবন্ধুর সাথে তার শেষ সাক্ষাতে (৫ অগাস্ট ১৯৭৫) তারা দুজনই দেশ পরিচালনা, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ও দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা সবই আলোচিত হয়েছিল ও পরদিন রাষ্ট্রদূত বোস্টার যে তারবার্তায় এই সাক্ষাতের প্রতিবেদন ওয়াশিংটনে পাঠান সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর এরকম প্রশংসা করে বিস্তর স্তুতিবাক্য লিখেছিলেন। কিন্তু তিনি প্রতিবেদনের ভাষা বিন্যাসে এই কথাও লিখতে ভোলেননি যে, বঙ্গবন্ধু তাকে তার রাষ্ট্রচিন্তার যে দর্শন ব্যাখ্যা করেছিলেন তাতে মার্কিন সরকারের বিচলিত হবার যথেষ্ট কারণ আছ-

“আমি মার্ক্সিস্ট নই। আমি একজন সমাজতান্ত্রিক কিন্তু সেটা আমার নিজস্ব পথে। আমি সব দেশের বন্ধু হতে চাই কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কোন দেশ ভাবুক আমাকে কী করতে হবে সেটা সে বলে দেবে।” (I am not a Marxist. I am a Socialist, but a Socialist in my own way. I want to be friends with all countries but I don’t want any country to think it can tell me what to do) । এই প্রতিবেদনের শেষে সারমর্মে বোস্টার লিখেন- “His repetiation of the theme that he is not a Masrxist, his insistance thay no other power can tell him what to do, and his volunteered criticism of communist China’s farm system all seem intended to ease our minds about the political direction he is taking.”

বোস্টার স্বর্গরাজ্যে বাস করতেন তাই তার অভিজ্ঞ কর্মজীবনের অন্যান্য সাফল্য-ব্যার্থতার সঙ্গে গুলিয়ে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ভেবেছিলেন বড় দেশগুলোর মন জয় করতেই বুঝি তিনি এমন করে কথা বলেছেন। সেটা যে মোটেও নয়, বোস্টার তা জানতেন কিন্তু কূটনীতির ‘হিপোক্রেসির’ আড়ালে থেকে তিনি নিজেদের জন্যে উপযোগী কথা সাজিয়ে নিয়েছিলেন ও লিখেছিলেন। যদি তাই-ই হতো বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলার চক্রান্তে তাদের সায় থাকত? আর না থাকলে জিয়াকে কেন ভালো প্রশাসক মনে হয়েছিল তার?

জিয়া কি বঙ্গবন্ধুর সমকক্ষ ছিলেন? এখন যদি আমরা প্রশ্ন করি, বোস্টার কবে থেকে জিয়াকে চিনতেন বা জানতেন? এমন কোনো রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শন জিয়ার কি ছিল যা বাস্তবায়নে দক্ষতা দেখে বোস্টারের মনে হয়েছিল জিয়া বঙ্গবন্ধুর চেয়ে দক্ষ প্রশাসক? এসবই ছিল কুচক্রীদের আগে থেকে ঠিক করা, ঠিক বঙ্গবন্ধু হত্যার আগের ও পরের তারবার্তা মিলিয়ে দেখলেও পাওয়া যায় মার্কিননীতির মধ্যে বঙ্গবন্ধুবিরোধী নীতির প্রভাব কতটা প্রবল ছিল যা ১৯৭১ সালে কিসিঞ্জারের নীতির পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার বাসনাকে তীব্র করেছিল। আর সে বাসনা চরিতার্থ করতে যুদ্ধকালীন থেকেই মার্কিন ফাঁদে পা দিয়েছিল বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুবিরোধী একদল অভিশপ্ত মানুষ।

পরের তথ্য অনুসন্ধানের বিশ্লেষণের আগে আমাদের জানা দরকার এই রাষ্ট্রদূত বোস্টার কে ছিলেন ও কী তার পেশাগত তৎপরতা ছিল। ডেভিড ইউজেন বোস্টারের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ওহায়ো অঙ্গরাজ্যে ১৯২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। প্রথম জীবনে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ট্রেনিং সেন্টারের শিক্ষা অফিসার হিসেবে তিনি কাজ করতেন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌ-বাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধের শেষে সিআইএ, পররাষ্ট্র দপ্তর ও নৌবাহিনীতে বেসামরিক চাকরির জন্যে আবেদন করেন ও তিনটি চাকরির জন্যেই নির্বাচিত হন। যদিও তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরের কাজই বেছে নেন ও প্রথম পোস্টিং পান ১৯৪৭ সালে মস্কোতে পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে।

কালে কালে তিনি সদর দপ্তর হয়ে সমাজতান্ত্রিক বলয়ের পূর্ব জার্মানিতে কাজ করেন। ১৯৫৮ সালে ওয়াশিংটনে ফিরিয়ে এনে তাকে তখনকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) জন ফসটার ডালাসের বিশেষ সহকারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইজেনহাওয়ারের সে আমল ছিল সোভিয়েতবিরোধী স্নায়ুযুদ্ধের তুমুল বিতর্কের সময় যার অন্যতম সহযোগী ছিলেন এই বোস্টার। পরবর্তীকালে তিনি মেক্সিকো ও ল্যাটিন আমেরিকার একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নাম করেছিলেন ও সমজাতান্ত্রিক বিশ্বের উত্থান ঠেকাতে মার্কিননীতির কট্টর অফিসার ছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের আনুপূর্বিক বিশ্লেষণে বোস্টার সদর দপ্তরকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। পরে তিনি নেপাল ও পোল্যান্ডে কর্মরত ছিলেন।

নেপাল ছাড়া তার অন্যান্য সব নিয়োগে সদর দপ্তরের আকাঙ্ক্ষাই কাজ করেছে বেশি। ১৯৭৪ সালে তাকে জেনেভায় একটি নিয়োগ দেয়া হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করা হচ্ছে এমন একটি কথা ছড়িয়ে পড়ে। জানুয়ারিতে বোস্টার ওয়াশিংটনে তার এক সহকর্মী ল্যারি ইগলবার্গারের সঙ্গে আলাপ করেন যিনি কিসিঞ্জারের খুব কাছের লোক ছিলেন। তিনি তাকে নিশ্চিত করেন যে, তিনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যাচ্ছেন। সে নিয়োগের কথা শুনে বোস্টার একজন কর্মকর্তার কাছে নাকিস্বরে জানতে চান, সেখানে আর কোনো বিশেষ কাজ তার রয়েছে কিনা (I swallowed hard, grumbled and asked whether there was any other assignment)। আমাদের অনুসন্ধান করতে হবে এই কথা দিয়ে বোস্টার সেদিন কী বোঝাতে চেয়েছিলেন? আর কী উত্তর তিনি ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে পেয়েছিলেন।

প্রশ্ন হলো পূর্ব ইউরোপ ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক বলয়ের এমন একজন তুখোড় ও অভিজ্ঞ কূটনীতিককে কিসিঞ্জার কেন বাংলাদেশের জন্যে নির্বাচিত করলেন? সেটা সহজেই অনুমেয়, বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত ও প্রবর্তিত কৃষক–শ্রমিক উন্নয়নের যে বাংলাদেশ তখন গঠিত হতে যাচ্ছিল তা থামাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের নিতেই হবে। এরকম একজন অভিজ্ঞ বা ঝানু কূটনীতিক ছাড়া যে এই দেশে তা সম্ভব নয়, সেটা খোদ কিসিঞ্জারও হয়তো উপলব্ধি করেছিলেন।

বোস্টারের ১৬ অগাস্ট ১৯৭৫ সালের প্রতিবেদনেই দেখা যাচ্ছে, তার বিবরণ-

“গত ২৪ ঘণ্টার পরিস্থিতি দেখে এটা স্পষ্ট যে, পুলিশ, প্যারা মিলিটারি বাংলাদেশ রাইফেল ও রক্ষী বাহিনী সবাই এই ঘটনা মেনে নিয়েছে। সাধারণ মানুষ কোনো উল্লাস প্রকাশ না করলেও বোঝা যাচ্ছে তারা সব মেনে নিয়েছে ও স্বস্তিবোধ করছে। একই প্রতিবেদনে তিনি জানিয়েছেন-

“হত্যাকাণ্ড সংঘটনের সময় মুজিবের ভাগ্নে শেখ মণির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতেও পরিকল্পনাকারীরা সময় নিতে চায়নি।” তার মানে কি এই নয় যে, এসব খুঁটিনাটি সিদ্ধান্তের কথা বোস্টার জানতেন? না হলে সংঘটিত পরিস্থিতিতে হত্যাকারী বা পরিকল্পনাকারীদের মনের ভাবনা ও যুক্তি কী ছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনিইবা জানলেন কেমন করে! হত্যাকারীরা তখনও এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি যে তারা কেন বঙ্গবন্ধুর পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনদের ও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মীদের হত্যা করেছিল ও কী তাদের উদ্দেশ্য ছিল?

মোশতাকের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে তারা বঙ্গবন্ধু হত্যার কথাই ঘোষণা করছিল যদিও সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষদের না বোঝার কারণ ছিল না যে, বঙ্গবন্ধুর দর্শনের হত্যা করতে তার সহযোগীদেরও হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পৈশাচিকতা থেকে এ-ও প্রমাণিত যে, এই ঘটনার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রতিশোধস্পৃহা। সে প্রতিশোধস্পৃহা ছিল একাধারে রাজনৈতিক-ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে, তার দিক-নির্দেশক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গঠনের সবরকম উদ্যোগের বিরুদ্ধে।

৫ অগাস্ট বোস্টারের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধু তার উন্নয়ন দর্শনের ব্যাখ্যা করতে যেয়ে যে সমবায় আয়োজনের কথা বলেছিলেন তাতে আমরা অনুমান করতে পারি বোস্টারের ভ্রু কুঞ্চিত হয়েছিল, না হলে এই আলোচনার এত বিস্তারিত ওয়াশিংটনে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকত না। কারণ ওই সময়টা যে মুখ্য বোস্টারকে নিশ্চয়ই তা প্রমাণ করার দরকার হয়ে পড়েছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধু যে চীনের পরিবার ভেঙে দেয়া কৃষি সমবায়ী পদ্ধতি বাংলাদেশের জন্যে উপযুক্ত হবে না আর চীনাদের তিনি তা ১৯৫৭ সালেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, সে ব্যাখ্যা শুনে নিশ্চয়ই বোস্টার বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চিন্তা কতটা পরিপক্ব এটা ভেবে সে আলোচনার বিস্তারিত উল্লেখ করতে কোনো ভুল করেননি। চলবে…

নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১০ নভেম্বর, ২০২১, লিঙ্ক

এমনও অনেক মানুষ আছেন ১৯৭১ সালে যারা গৌরবময় ভূমিকা রেখেছিল, পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু সরকারের সব সাফল্যের সুবিধা নিয়ে বড় পদে আসীন হয়েছে, তারা ’৭৫ সালের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টে ফেলে। বঙ্গবন্ধুহত্যার দায়মুক্তির দায় থেকে এদের কেন আমরা বাদ দিতে যাব? এটা কি স্বতঃসিদ্ধ ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর পর এভাবেই ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘুরিয়ে দেয়া যাবে, আর সেই রথযাত্রায় অংশ নিতে কেউ কেউ তৈরিই ছিল?

(গতকালের পর)

আমাদের মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুহত্যা প্রচেষ্টার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। আমরা লক্ষ করেছি ১৯৪৮ সালেই বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের স্বাধীনতাকে ‘গণ-আজাদী নয়’ বলে একটি বিবৃতি দিলেন তখনই তার সুস্পষ্ট প্রতিপক্ষ তৈরি হয় যারা বস্তুতপক্ষে সুবিধাবাদী ও বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। ১২ অগাস্ট ১৯৪৮ সালে দেয়া এই বিবৃতি পরদিন দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় ছাপা হয় এই শিরোনামে- “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা দিবস, ছাত্র সম্প্রদায়ের কর্ত্তব্য– বিশিষ্ট লীগ কর্ম্মী শেখ মুজিবর রহমানের বিবৃতি (ঢাকা অফিস হইতে প্রাপ্ত)। ঢাকা, ১২ই আগস্ট- অধুনা বিলুপ্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক লীগ কাউন্সিলের সদস্য ও পূর্ব্ব-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা শেখ মুজিবর রহমান নিম্নোক্ত বিবৃতি দিয়াছেন:-

১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট আমরা যে ‘আজাদী’ লাভ করিয়াছি, সেটা যে গণ আজাদী নয়, তা’ গত একটি বছরে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। ‘জাতীয় মন্ত্রিসভা’ দীর্ঘ একটি বছরে জনগণের দুইশ’ বছরের পুঞ্জীভূত দুঃখ-দুর্দ্দশা মোচনের কোন চেষ্টা ত করেনই নাই, বরঞ্চ সেই বোঝার উপর অসংখ্য শাকের আটি চাপাইয়াছেন। ভুখা, বিবস্ত্র, জরাগ্রস্ত ও শত অভাবের ভারে ন্যুব্জ জনসাধারণের ভাত, কাপড়, ওষুধ পত্র ও অন্যান্য নিত্য-ব্যবহার্য্য দ্রব্যের কোন ব্যবস্থা তাঁরা করেন নাই; বরঞ্চ পাট, তামাক শুপারী ইত্যাদির উপর নয়া ট্যাক্স বসাইয়া ও বিক্রয়-কর বৃদ্ধি করিয়া জনগণের দৈনন্দিন জীবন দুর্ব্বিসহ করিয়া তুলিয়াছেন। বিনা খেসারতে জমিদারী বিলোপের ওয়াদা খেলাপ করিয়া তাঁরা জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদিগকে পঞ্চাশ ষাট কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করিতেছেন। নুতন জরীপের নাম করিয়া তাঁরা জমিদারী প্রথার সম্পূর্ণ বিলোপ আট বছর স্থগিত রাখার ষড়যন্ত্র করিতেছেন। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অছিলায় তাঁরা অনেক দেশভক্ত লীগ-কর্ম্মীকেও বিনা বিচারে কয়েদখানায় আটকাইয়া রাখিতেছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মুসলিম ছাত্র সমাজের উপর এবং আরও কতিপয় ক্ষেত্রে জনতার উপর লাঠিচার্জ্জ, কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার ও গুলি চালনা করিয়া তাঁরা আজাদীকে কলঙ্কিত করিয়াছেন। আজ সেই মন্ত্রীসভাই আজাদী উৎসবের সাময়িক সমারোহের দ্বারা নিজেদের অথর্ব্বতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা ঢাকিবার প্রয়াস পাইতেছেন” (এ উদ্ধৃতিতে মূল বানান হবহু রাখা হয়েছে)।

এই বিবৃতির উদ্ধৃত বাক্যগুলোয় প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর জীবনের সংগঠিত আদর্শই প্রকাশিত হয়েছে যা থেকে মৃত্যুর শেষদিন পর্যন্ত তিনি একবিন্দু বিচ্যুত হননি। দুইশ’ বছরের ব্রিটিশ অপশাসনের পর প্রাপ্ত স্বাধীনতা যে মাত্র এক বছরে বাংলাদেশের মানুষকে হতাশ করেছিল তার বিবরণ আছে ২৮ বছর বয়সের শেখ মুজিবুর রহমানের এই বিবৃতির প্রতিটি শব্দ ও উচ্চারণে। দেখা যাচ্ছে তিনি তখনকার সরকার, মন্ত্রিসভা এমনকি জমিদারিপ্রথা বিলোপের অঙ্গীকার থেকে সরে আসা নিয়েও ক্ষোভ জানাচ্ছেন।

সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসায় অঙ্গীকারবদ্ধ এই যে দেশপ্রেমিক অথচ বিদ্রোহী চরিত্রের শেখ মুজিব তার মৃত্যুর পরোয়ানা তখনই জারি হয়েছিল। তখন মনের মধ্যে একটি অপবিশ্বাস লুকিয়ে রেখে ওই চক্র এই ভেবে হয়তো অপেক্ষা করেছে ‘দেখি মুজিব কী করতে পারে’! কিন্তু একই বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু যে নতুন স্বাধীনতা লাভের আকাঙ্ক্ষার ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলেন অশিক্ষিত সুবিধাবাদী কুচক্রের পক্ষে সে বক্তব্যের তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব ছিল না। বঙ্গবন্ধু বিবৃতির শেষপর্যায়ে বলেছিলেন-

“বস্তুতঃ গণ-আজাদীর পরিবেশ সৃষ্টি না করিয়া আজাদী উৎসব করিতে যাওয়া এবং বন্যাক্লিষ্ট, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মরণোন্মুখ জনগণকে সেই উৎসবের শরীক হইতে বলা নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কিছু নয়। এই প্রহসনে আত্মপ্রতারিত ‘নেতারাই’ সন্তুষ্ট থাকিতে পারেন, জনগণ- বিশেষ করিয়া সচেতন ছাত্র ও যুব-সমাজ উহা দ্বারা বিভ্রান্ত হইবে না। তারা ‘আজাদী দিবস’ অবশ্যই পালন করিবে, কিন্তু সেটা উৎসবের দিন হিসাবে নয়, উৎপীড়নের নিগঢ় ছিন্ন করার সংকল্প নেওয়ার দিবস হিসাবে পালন করিবে”

বঙ্গবন্ধুর এই “উৎপীড়নের নিগঢ় ছিন্ন করার সংকল্প” ১৫ অগাস্ট ১৯৭৫ সালের শেষদিন পর্যন্ত তার প্রধান আদর্শ ছিল। সেই আদর্শের সঙ্গে তিনি কোনো আপস করেননি বলেই ১৯৪৮ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত ২৭ বছর পদে পদে মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে দেশমাতৃকার সেবা করতে পেরেছেন, নতুন একটি ভুখণ্ড এনে দিয়ে বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার ‘নিগঢ় ছিন্ন’ করাতে পেরেছিলেন। আর তার প্রতিশোধ হিসেবে সেই কুচক্র যারা ১৯৪৮ সাল থেকে প্রমাদ গুণেছেন তারা ও তাদের দোসরেরাই ১৫ অগাস্টের ঘটনা ঘটিয়ে সে পৈশাচিক ঘটনার বিচার না করার দায়মুক্তি পর্যন্ত দিতে পেরেছে।

আগের পর্বে আমরা উল্লেখ করেছি বঙ্গবন্ধু তার ৫ আগস্টের (১৯৭৫) সাক্ষাৎকারে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে তার আদর্শের আনুপূর্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই আদর্শ ছিল তখনকার মার্কিন নীতির পরিপন্থি। তারা খাদ্য ও অন্যান্য সাহায্য দিচ্ছিল বটে কিন্তু বাংলাদেশকে বাঁধতে চেয়েছিল নানারকম কূটবন্ধনে। সে সময়ের মার্কিন দলিলপত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় শেখ মুজিবের হাতে বা নেতৃত্বে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির ঠিক কোন পর্যায়ে আসীন হবে এই নিয়ে তাদের যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল।

মার্কিন বন্ধু পাকিস্তান তাদের প্রত্যক্ষ মারণাস্ত্র সহায়তা পেয়েও যুদ্ধ ও রাজনৈতিক কৌশলে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর কাছে পরাজিত হয়েছে, এই যন্ত্রণা পাকিস্তানের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অংশে কম ছিল না। পাকিস্তানের অপর বন্ধু চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নেয়নি এমনকি জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভে প্রকাশ্য আপত্তি করেছে ও বাধা দিয়েছে। ফলে স্বাধীনতা উত্তরকালে নানারকম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপেও যখন বঙ্গবন্ধু নতিস্বীকার না করে বলেন-

“আমি সমাজতান্ত্রিক কিন্তু সেটা আমার নিজস্ব মতে” বা যদি বলেন, “আমি সব দেশের বন্ধু হ’তে চাই কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কোন দেশ ভাবুক আমাকে কী করতে হবে সেটা সে বলে দেবে” তখন সে অক্ষশক্তির হাতে আর কোনো উপায় থাকে না যদি না বঙ্গবন্ধুকে নিশ্চিহ্ন করে পরিবার পরিজনসহ নির্মূল করে দেয়া যায়, যাতে তার রোপিত আদর্শের ছিটেফোঁটাও খুঁজে না পাওয়া যায়। যদিও পরে ইতিহাস সত্যপথে বাঁক নিয়ে তার উপযুক্ত জবাব দিচ্ছে।

এরকম এক বিশাল ব্যাক্তিত্ব, ২৭ বছরের রাজনৈতিক অনুশীলনের জীবনে যে মানুষ একটি দেশের ভৌগোলিক, নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক ও সোনার বাংলার অর্থনৈতিক পরিচয় বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে পেরেছিলেন তাকে যারা হত্যা করার মতো নৃশংস ক্ষমতা রাখে পুরস্কার হিসেবে তাদের দায়মুক্তি দেয়া মূল কুচক্রের জন্যে স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু সে দায়মুক্তির সুবিধা কি কেবল সেসব হত্যাকারী কিছু সদস্যই ভোগ করেছেন?

এ প্রশ্ন এখন আমরা করতেই পারি। যারা তাদের দায়মুক্তির আইন করেছিলেন, অব্যাহত রেখেছিলেন তারাও এর অংশীদার ছিলেন বলে বিবেচিত হওয়া উচিত কারণ রাষ্ট্রক্ষমতা ও ক্ষমতাভোগের সব রকমের সুবিধা নিয়ে দেশি-বিদেশি চক্রকে ধারাবাহিকভাবে তারা সন্তুষ্ট করতে সচেষ্ট ছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিলোপ সাধনে বংশ-পরপম্পরায় তাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না।

এমনও দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের পরে মোশতাক সরকার রাষ্ট্রাচারে বেশ অনেকগুলো পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান পরিবর্তন করে এর স্থলে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান চালু করে। একই সময় তিনি ‘বাংলাদেশ বেতার’ এই নাম পরিবর্তন করে রেডিও পাকিস্তানের আদলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ করে। ধীরে ধীরে, একুশ বছরে বাংলাদেশকে তার মূলনীতি থেকে সরিয়ে নেবারও সব রকমের চেষ্টা করা হয়।

আমরা মনে করি, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত নীতিনির্ধারণের যারা জীবন বাঁচানোর অজুহাতে ও চাকরি ঠিক রাখার অভিপ্রায়ে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শ জলাঞ্জলি দিতে সামান্য দ্বিধা করেনি তাদেরও ইতিহাসের কাঠগড়ায় একদিন দাঁড়াতে হবে।

কাগজপত্র ও ইতিহাসের দলিলগুলো নিয়ে বসলে আমরা বিচলিতবোধ করি। এমনও অনেক মানুষ আছেন ১৯৭১ সালে যারা গৌরবময় ভূমিকা রেখেছিল, পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু সরকারের সব সাফল্যের সুবিধা নিয়ে বড় পদে আসীন হয়েছে, তারা ’৭৫ সালের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টে ফেলে। বঙ্গবন্ধুহত্যার দায়মুক্তির দায় থেকে এদের কেন আমরা বাদ দিতে যাব? এটা কি স্বতঃসিদ্ধ ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর পর এভাবেই ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘুরিয়ে দেয়া যাবে, আর সেই রথযাত্রায় অংশ নিতে কেউ কেউ তৈরিই ছিল?

প্রসঙ্গত, যদি আমরা কূটনীতিক হোসেন আলীর কথা বলি যে হোসেন আলী ’৭১ সালে কলকাতা মিশনে পাকিস্তানের উপ-রাষ্ট্রদূত ছিলেন ও ১৮ এপ্রিল পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিনিই বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মিশনের যাত্রা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু তাকে প্রথমে অস্ট্রেলিয়া ও পরে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন (জানুয়ারি ১৯৭৩)। অথচ রাষ্ট্রদূত হিসেবে এই হোসেন আলীই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর, ১৯ অগাস্ট ১৯৭৫ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক সহকারী সচিব আলফ্রেড আথারটনের সঙ্গে দেখা করেন।

সেদিনই কিসিঞ্জার এই সাক্ষাতের একটি সারমর্ম ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে পাঠান, যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রদূত হোসেন আলী স্বীয় উদ্যোগে এই সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের মোশতাক সরকারের পররাষ্ট্র নীতি ব্যাখ্যা করেছেন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ সব সুপার পাওয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে বলে আশা করছে। শুধু তা-ই নয়, রাষ্ট্রদূত হোসেন আলী আথারটনের সঙ্গে আলাপকালে উল্লেখ করেন যে, ১৯৭১ সাল থেকেই মোশতাকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রয়েছে ও মোশতাককে একজন ধার্মিক, সৎ ও স্পষ্টবাদী মানুষ বলে বর্ণনা করেন (Drawing on his close friendship with new President Khondakar Mushtaque Ahmed during 1971 in Calcutta, he described him as “pious honest and straight forward”)।

এটা কেমন করে হলো? আমাদের মনে এই প্রশ্ন এমন অনেক ঘটনা ও মানুষ সম্পর্কে, যেসবের উত্তর মিলে না কিন্তু মহাকালের জন্যে খারাপ বিবেচনার দায় থেকে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমি কেমন করে কখন মুক্ত হবে সে চিন্তা থেকে আমরা বিরত থাকতে পারি না।

এসব কারণেই দলিলপত্র, ইতিহাস ও এ যাবৎ প্রকাশিত গোপন দস্তাবেজ বিশ্লেষণ করে আমাদের সংগত চিন্তা এই যে, বঙ্গবন্ধু হত্যায় যারা অস্ত্রচালনা করেছে তাদের বিচার না হওয়ার দায়মুক্তি দিয়ে বরং এই ঘটনার পরিকল্পক কুচক্র তাদের সহায়তাকারী, দেশি ও বিদেশি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক তথাকথিত এক শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিক-সামরিক, বেসামরিক আমলা, সুবিধাবাদী সাংবাদিক ও পরের সময়ে সুবিধাভোগী শ্রেণি নিজেদের পাপকাজ থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে এই দায়মুক্তির সবরকম সুবিধা নিয়েছেন। ফলে দায়মুক্তি সংঘটনে ও ২১ বছর তা অব্যাহত রাখতে এসব সুবিধাভোগীদের ভূমিকা ছিল না বা দায় নেই একথা বলা যায় না। চলবে…

নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১১ নভেম্বর, ২০২১, লিঙ্ক

এই দায়মুক্তির সুবিধা নিয়েছে মার্কিন ও চীন সরকার। পরের সরকারগুলোর আমলে এই দুই পরাশক্তি যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তারা তাদের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ ছাড়াও বাংলাদেশকে আদর্শচ্যুত করতে যেসব পদক্ষেপ জিয়াউর রহমান নিচ্ছিলেন সেসব কর্মকাণ্ডকে প্রকারান্তরে বৈধতা ও সমর্থন দিচ্ছিল। এরকম অমানবিক নৈরাজ্যে পরাশক্তির পুতুল হয়ে বা দাসত্ব মেনে স্বাধীন বাংলাদেশে পরাজিত রাজনৈতিক অপশক্তি ও আমলাতন্ত্রও মিলেমিশে একাকার হয়েছিল, যার মূল্য বাংলাদেশকেই দিতে হয়েছে।

(গতকালের পর)

গত দুই পর্বের আলোচনায় আমরা লক্ষ করেছি বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য কুশীলবরা শুধু ’৭৫ সালেই তৎপর হয়েছিলেন এমন নয়, এদের পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। এ যাবৎকালে প্রাপ্ত সব তথ্য সাজিয়ে নিলে দেখা যায় কয়েকটি মোটা দাগে এসব পরিকল্পনার ছক আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় যার উদ্দেশ্যমূলে আছে-

১. প্রকৃতই হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে অপরাধীদের মুক্ত রাখা, চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা ও

২. কুশীলবদের অপর একটি অংশ সরকারের দায়িত্বভার নেয়া। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা এই কাজে এই দুই অংশকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জগতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে সহায়তা করেছে ও যে সহায়তা ছাড়া এদের পক্ষে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড সংঘটনের কাজ কখনও সম্ভব ছিল না ও হত্যাকাণ্ড-উত্তর রাষ্ট্রকে স্বাধীনতার মৌলিক নীতি থেকে সরিয়ে নিয়ে উল্টোমুখী নীতি স্থাপন করে পরিচালনা করা কখনই সম্ভব হতো না তারা কারা? ইতিহাসের তথ্য প্রমাণে দেখা যায়, বাংলাদেশের এই তথাকথিত ‘ক্রান্তিলগ্ন’ তৈরি করে তাকে ভিন্ন ভাবধারায় পরিচালনার জন্যে

স্বাধীনতার পর পরই এদেশে যেসব অবাস্তব রাজনৈতিক তত্ত্ব উপস্থাপন করা হয়েছিল সেসব অর্বাচীন দার্শনিকেরা ইতিহাসের এই রূপান্তর পটের জন্যে কম দায়ী নয়। এসব তত্ত্বভূতের নায়কেরা বঙ্গবন্ধু সরকারকে অশান্ত করে রাখতে কোনো একটি শক্তির কাছে দায়বদ্ধ ছিল যার প্রমাণ ৩-৭ নভেম্বরের অস্থির সময়ে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা কিন্তু আর একটি অক্ষ শক্তির ক্রীড়নক হয়ে তারা পরাস্ত হয়েছিল কারণ সে পরাশক্তির কৌশল বুঝবার ক্ষমতা তাদের ছিল না।

দ্বিতীয়ত, আমাদের মিলিয়ে দেখতে হবে বঙ্গবন্ধুহত্যা সংঘটনের পর কারা বেশি সুবিধা ভোগ করেছে? খন্দকার মোশতাক, নাকি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে দেবার ওই ১২ জন অপরাধী নাকি পরেরকালের সরকারপ্রধান জিয়াউর রহমান ও এরশাদ? আমাদের প্রশ্ন মোশতাকের আমলের আপত্তিকর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বহাল রাখল কেন? এরশাদ শুধু তা বহালই রাখেনি হত্যাকারীদের রাজনীতিও করতে সুযোগ দিয়েছে, এমনকি সংসদেও যাবার পথ করে দিয়েছে।

এমনকি সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে এসে খালেদা জিয়াও সে দায়মুক্তির আদেশ বহাল রেখেছে! পাঠক একবার ভাবুন, প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি দেয়া হত্যাকারী যারা জাতির পিতাকে, একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করেছে আর তাদের সে হত্যাকে আইন করে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে, তারা দেশে বুক ফুলিয়ে রাজনীতি করেছে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের আইনসভার নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে এসেছে- এসব তথ্য জেনে একটি গর্বিত স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বিবেকের কাছে কী উত্তর আপনার দেবার আছে?

আমাদের তথ্য অনুসন্ধান ও গবেষণায় দেখা যাচ্ছে মোশতাক সরকারের সঙ্গে পরাশক্তির সম্পর্ক গঠনে যেসব আমলা ও কূটনীতিক ভূমিকা রেখেছেন তাদের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করা যা গুটিকয় দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা ছাড়া বেশিরভাগই করেননি কারণ তাদের চাকরি ও জীবন রক্ষার অজুহাত ছিল। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করায় বা মেনে না নেবার ফলে কেউ কেউ নানারকম ঝামেলায় পড়েছিলেন ঠিকই কিন্তু বেসামরিক কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত নেই। চাকরি বজায় রেখেও সে প্রতিবাদ করা যেত যদি বিবেকের দংশন তাদের থাকত।

তারা ভুলে গিয়েছিলেন যে বঙ্গবন্ধুর আপসহীন সংগ্রামের ফলে যদি বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডের জন্ম না হতো তারা কোনোদিন রাষ্ট্রদূত বা সচিব হওয়া তো দূরের কথা পাকিস্তানিদের গোলামি করেই নিম্নস্তরে থেকে চাকরির বেতন পেতে হতো, তাও কোনো স্বাধীন দেশের কর্তব্যপরায়ণ নাগরিকের অধিকারে নয়। কিন্তু যে সৌভাগ্যের দরজা বঙ্গবন্ধু তাদের খুলে দিয়েছিলেন প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, তারা সে আনুগত্যের বদলে বিশ্বাসঘাতকতাই করেছেন। সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তা, যাদের জিয়াউর রহমান ও এরশাদ বেছে বেছে ফাঁসি দিয়েছে, যদিও সেসব হত্যাকাণ্ডের ন্যায্যবিচার আজও হয়নি।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের ৭ নভেম্বর রিয়াল অ্যাডমিরাল এম এইচ খানকে নৌ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেন, যিনি দেখা গেল ৭৫-এর পট পরিবর্তনের পরে জিয়াউর রহমানের অধীনে উপ-সামরিক আইন প্রশাসক হলেন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি নথিপত্রে ১ জুলাই ১৯৭৬ সালে কিসিঞ্জারের লেখা একটি প্রতিবেদনে পাওয়া গেল এই অ্যাডমিরাল খানের দূতিয়ালি, ওয়াশিংটনে তখনকার রাষ্ট্রদূত এম আর সিদ্দিকীকে (বঙ্গবন্ধুর প্রথম সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী) নিয়ে ইউএস এইডের প্রশাসক ড্যানিয়েল পার্কারের সঙ্গে দেখা করতে যান ও জিয়াউর রহমা্নের সামরিক সরকারের জন্যে কৃষি-খাদ্য, রেলওয়ে ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়তা প্রার্থনা করেন যেগুলোর অধিকাংশই মঞ্জুর হয়।

এছাড়া অ্যাডমিরাল খান ছটি হেলিকপ্টার সহায়তা চাইলে পার্কার তা প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে, সাহায্য সহায়তায় এরকম সুযোগ নেই। কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য এই প্রতিবেদনে আছে যা হলো- বঙ্গবন্ধুর আমলে কিউবায় পাট বিক্রয়ের অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র যে খাদ্য সহায়তা বন্ধ করেছিল অ্যাডমিরাল খান তা তুলে নিতে অনুরোধ করেন। উপস্থিত মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সহকারী সচিব গার্ডিনের থ্যাকার নিশ্চিত করেন যে তা মঞ্জুর করা হয়েছে (The Admiral asked that we consider a waiver to permit Bangladesh to sell Jute to Cuba. Gardiner confirmed that waiver has been granted).

এখন যদি আমরা প্রশ্ন করি কিউবার সঙ্গে পাট বিক্রয় নিয়ে কিসিঞ্জার যে হুলস্থুল করে বঙ্গবন্ধু সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করল, এক আলোচনায় তা প্রত্যাহার হলো কেমন করে? তাহলে পরের সরকারগুলো টিকিয়ে রাখতে যে মার্কিন চেষ্টা তার সঙ্গে এই বিবেকহীন সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের আর দায়মুক্তি পাওয়া খুনিদের পার্থক্য থাকল কোথায়!

এই দায়মুক্তির সুবিধা নিয়েছে মার্কিন ও চীন সরকার। পরের সরকারগুলোর আমলে এই দুই পরাশক্তি যারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তারা তাদের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ ছাড়াও বাংলাদেশকে আদর্শচ্যুত করতে যেসব পদক্ষেপ জিয়াউর রহমান নিচ্ছিলেন সেসব কর্মকাণ্ডকে প্রকারান্তরে বৈধতা ও সমর্থন দিচ্ছিল।

এরকম অমানবিক নৈরাজ্যে পরাশক্তির পুতুল হয়ে বা দাসত্ব মেনে স্বাধীন বাংলাদেশে পরাজিত রাজনৈতিক অপশক্তি ও আমলাতন্ত্রও মিলেমিশে একাকার হয়েছিল, যার মূল্য বাংলাদেশকেই দিতে হয়েছে। আর এ সুযোগে এদেশে জন্ম নিয়েছে একটি লুটেরা মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যে শ্রেণি পরবর্তীকালে আদর্শহীন রাজনীতি ও অপসংস্কৃতিচর্চার মধ্যে বিকশিত হয়ে বাংলাদেশকে তার বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলমন্ত্র থেকে সরিয়ে নিতে প্রয়াস পেয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে ঐতিহাসিক বন্ধন তা সাংস্কৃতিক। ১৯৭১ সালের মার্কিন নীতিতে তাকেও তুচ্ছ করে দেখা হয়েছিল যার প্রমাণ দেয় হোয়াইট হাউসের নিক্সন ট্যাপ ও সেসময়ের নথিপত্রে। ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনুরাগী মার্কিন গবেষক অধ্যাপক গ্যারি বাস লিখেছিলেন-

“নিক্সন এবং কিসিঞ্জার কেবল চৈতন্য বা ভারতের সোভিয়েতপন্থি ঝোঁকের গোপন কারণে পাকিস্তানের প্রতি সহায়তার বৈষম্যমূলক রিয়েলপলিটিক্স দ্বারা অনুপ্রাণিত হননি। হোয়াইট হাউসের অডিওগুলো নিক্সনের অভ্যাসগত অশ্লীলতা ও মানসিক ক্রোধেরই বহিঃপ্রকাশ। ওভাল অফিসে নিক্সন কিসিঞ্জারকে বলেছিলেন- ভারতীয়দের ‘একটি বিশাল দুর্ভিক্ষের দরকার’ ছিল। কিসিঞ্জারও এমনই কটাক্ষ করেছিলেন যারা মৃত্যুমুখী বাঙালিদের জন্য রক্তপাত করেছিলেন। (Nixon and Kissinger were not just motivated by dispassionate realpolitik, weighing Pakistan’s help with the secret opening to China or India’s pro-Soviet leanings. The White House tapes capture their emotional rage, going far beyond Nixon’s habitual vulgarity. In the Oval Office, Nixon told Kissinger that the Indians needed “a mass famine.” Kissinger sneered at people who “bleed” for “the dying Bengalis.”)। এমন বিকৃত মার্কিননীতির সুবিধা কিসিঞ্জারের শেষদিন পর্যন্ত অব্যাহতই ছিল আর সে সুবাদে জিয়াউর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত প্রতিশোধপরায়ণ মৌলবাদী শক্তি, চীনাপন্থি বাম ঘরানার অপরাজনৈতিক শক্তি মিলেমিশে যে ক্ষমতাভোগী চক্রের জন্ম হয়েছিল ভারতবিরোধিতা ছাড়া আর কোনো অস্ত্র তাদের হাতে ছিল না।

আর আমরা জেনেশুনে পরবর্তীকালে ভারতের প্রতি অকৃতজ্ঞ রাজনৈতিক দাসে পরিণত হয়েছি কারণ বঙ্গবন্ধুহত্যার দায়মুক্তি সে পথ সহজ করে দিয়েছিল। ফলে, এখন এ কথা বলতে কোনোই দ্বিধা নেই যারা বঙ্গবন্ধুহত্যা পরবর্তীকালের সুবিধাভোগী তারা দায়মুক্তির সুবিধা নিয়েই নিজেদের ভোগ চূড়ান্ত করেছে। সুতরাং দায়মুক্তি আইনের বিলোপ বা হত্যাকারীদের বিচার হলেও এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে পরিকল্পনাকারীদের খুঁজে বের করা আর সুবিধাভোগীদের বিচারের কাজ।

পরিকল্পনাকারীদের চক্র তাদের কাজ সমাধা করে দিয়েছে বটে কিন্তু এর সুবিধা নিয়ে যারা কষ্টার্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের দর্শন, চিন্তা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি অপসমাজ গড়ে তুলেছে তার দায়ীদেরও বিচারের সন্মুখীন করা দরকার। এমন হতে পারে না যে কেউ এসে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে তার জন্মের ইতিহাস মুছে দেবে, বিকৃত করবে ও মিথ্যা ইতিহাস গড়তে সচেষ্ট থাকবে আর সেসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। যদি এদের বিচার না করা হয় তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সব ত্যাগের তাৎপর্য মূল্য হারাবে। (শেষ)

নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১২ নভেম্বর, ২০২১, লিঙ্ক

লেখক:রেজা সেলিম, পরিচালক, আমাদের গ্রাম গবেষণা প্রকল্প, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন