মুক্তিসংগ্রামের মহানায়ক

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

বিখ্যাত পত্রিকা ‘নিউজ উইক’ বঙ্গবন্ধুকে এক অনন্য ‘সুপারম্যান’ ও ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তার সম্পর্কে বিদেশি সাংবাদিক সিরিল ডান বলেছেন, ‘বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবই একমাত্র নেতা, যিনি রক্ত-বর্ণ, ভাষা-কৃষ্টিতে এবং জন্মসূত্রেও ছিলেন খাঁটি বাঙালি। জনগণকে নেতৃত্বদানের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সাহস তাকে এ যুগের এক বিরল মহানায়কে রূপান্তর করেছে।’

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় তথা বাংলাদেশের জন্ম ও সাফল্যের মূলে যার অবদান সবার ঊর্ধ্বে, তিনি হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি তেজস্ক্রিয় পদার্থের ন্যায় ঝলসে উঠেছিলেন এবং তার এই তেজোদীপ্ত অবদানের কারণে তিনি পাকিস্তানের দীর্ঘ ২৩ বছরে ১৪ বার গ্রেপ্তার, প্রায় ১৩ বছর রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ এবং দুইবার ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল প্রায় সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি আমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন, তাই সমকাল তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির মর্যাদা।

অবিসংবাদিত মহান নেতা বঙ্গবন্ধু বাঙালির জাতীয় চেতনার এক প্রজ্বলিত শিখা। তিনি ছিলেন সমগ্র বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের অগ্রনায়ক। হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তার সুদক্ষ ও সফল নেতৃত্বের ফসল হচ্ছে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। লাল-সবুজের একটি পতাকা। পৃথিবী নামক এই গ্রহটিতে বাঙালি জাতির নিজস্ব পরিচয় ও ঠিকানা। এই মহান ত্যাগী ও সংগ্রামী নেতা সম্পর্কে এত সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরা সত্যিই কঠিন। নতুন প্রজন্মের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিজ চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি; কিন্তু ইতিহাসের পাতা বিশ্লেষণ করে আমরা এই মহান নেতার জীবন ও আদর্শ থেকে এটাই উপলব্ধি করতে পারি যে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটত না। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সংগ্রামী জীবন, সাহস, নেতৃত্ব, ত্যাগ ও মানবিক গুণাবলি লিখে কখনও শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির দিশারি, এক আপসহীন নেতা ও রাজনীতিবিদ।

এ কারণেই বিখ্যাত পত্রিকা ‘নিউজ উইক’ বঙ্গবন্ধুকে এক অনন্য ‘সুপারম্যান’ ও ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তার সম্পর্কে বিদেশি সাংবাদিক সিরিল ডান বলেছেন, ‘বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবই একমাত্র নেতা, যিনি রক্ত-বর্ণ, ভাষা-কৃষ্টিতে এবং জন্মসূত্রেও ছিলেন খাঁটি বাঙালি। জনগণকে নেতৃত্বদানের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সাহস তাকে এ যুগের এক বিরল মহানায়কে রূপান্তর করেছে।’

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির দর্শন ছিল ব্যতিক্রম ও প্রগতিশীল। তিনি বাঙালির নাড়ির স্পন্দন, আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা মনেপ্রাণে উপলব্ধি করতেন। তার এ উপলব্ধি পরবর্তী সময়ে বাঙালির আকাঙ্ক্ষার ও মুক্তিসংগ্রামের একমাত্র পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাজনীতির সর্বক্ষেত্রে তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সাফল্যের সঙ্গে। বাঙালি জাতি ভূষিত করল তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু রাজনীতির গৌরবমণ্ডিত অর্জন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বঙ্গবন্ধু হন সমগ্র বাঙালি জাতির পিতা। ৩০ লাখ শহিদ ও ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ঊষালগ্নে তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। যত দিন একজন বাঙালি বেঁচে থাকবে, তত দিন তারা অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন হতে দেবে না।

বাঙালিকে পরাধীন রাখতে পারে এমন কোনো শক্তি পৃথিবীতে আর নাই।’ বাঙালি জাতির নিজস্ব ঠিকানা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পর পরই তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা মানে একটি নিজস্ব পতাকা মাত্র নহে। জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ স্বাধীনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও চেয়েছিলেন বাঙালি জাতিকে একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। তার এ স্বপ্ন উচ্চারিত হয় তারই সুকণ্ঠে- ‘বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করে কোনো দেশ কখনও আত্মমর্যাদাপূর্ণ ও মহান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভ করতে পারে না।’

শুধু রাজনীতির সফল ব্যক্তি নয়, বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক নরম ও কোমল হৃদয়ের উদার মানুষ।

১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার সমাজতান্ত্রিক নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় কখনো দেখিনি। আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। সাহস ও ব্যক্তিত্বে এ মানুষটি হিমালয়ের মতোই উঁচু।’ বঙ্গবন্ধু তার ব্যক্তিত্ব ও স্বদেশপ্রেম দ্বারা বিশ্বসভায় বাঙালিকে অত্যন্ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে ব্রিটিশ মানবতাবাদী আন্দোলনের অগ্রনায়ক লর্ড ফেন্নার ব্রোকওয়ে একদা মন্তব্য করেছিলেন, ‘নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও আয়ারল্যান্ডের জর্জ ডি ভেলেরার চেয়েও মহান ও অনন্য।’ তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি একই সঙ্গে একটি স্বাধীন জাতি ও স্বাধীন ভূমির জনক।

দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের ফসল হিসেবে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ ছিল অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত একটি ভূখণ্ড। অধিকন্তু, স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশীয় আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদাররা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে বাঙালি জাতির চিন্তাকোষে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করে। এমন এক পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বাঙালি জাতি যখন অগ্রসরমাণ, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক ও দেশীয় কুচক্রী মহল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতের অন্ধকারে অত্যন্ত নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।

বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৫ আগস্টের মতো ঘৃণ্যতম ও কলঙ্কজনক দিন আর নেই। তারপর শুরু হয় বাঙালির গর্বের ধন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির নানা রকম অপকৌশল। পুরস্কৃত করা হয় স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের। অনেক চড়াই-উতরাইয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সব অন্ধকার দূরে ঠেলে বাঙালি জাতিকে একতাবদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন দৃঢ় প্রত্যয়ে।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্ব যেমনি সমগ্র বাঙালি জাতিকে মুক্তিসংগ্রামে সফলতা এনে দিয়েছিল, তেমনি তার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বাঙালি জাতি আজ আপসহীন। স্বাধীনতাসংগ্রামের চেয়েও শোষণ-নিপীড়নমুক্ত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ একটি উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রাম আরও কঠিন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও চেতনা সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে জননেত্রী শেখ হাসিনার এই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সংগ্রামকে সফলতা এনে দেবে। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, বাংলা ভাষা থাকবে, বাংলা সংস্কৃতি ও সভ্যতা থাকবে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বহমান থাকবে এবং জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচয় থাকবে, তত দিন এ দেশে প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব, চির অম্লান, বাঙালি চেতনায় অনির্বাণ শিখা হিসেবে প্রজ্বলিত থাকবেন এবং সভ্যতার শেষ দিন পর্যন্ত শেখ মুজিব নামটি উচ্চারিত হবে।

লেখক : মো. নূরে আলম সিদ্দিকী, সহকারী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

নিউজবাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, লিঙ্ক

আরও পড়ুন