স্মৃতির পাতায় বঙ্গবন্ধু : আমাকে মিষ্টি খেতে বললেন বঙ্গবন্ধু

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

এম এ মান্নান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দূর থেকে অনেকবার দেখেছি। এছাড়া আমি ঢাকায় বসবাস করায় খবরের কাগজে তাকে সবসময় দেখতাম। টেলিভিশনে দেখতাম। মাঠে তার যত বক্তৃতা ছিল, তার প্রায় সবগুলোই মাঠে গিয়ে শোনার চেষ্টা করতাম। মনে করতাম, তিনি আমাদের ‘আজাদী’, তিনি স্বাধীনতা এনে দেবেন। কারণ সে সময় ছয় দফার পরিষ্কার কর্মসূচি তিনি ঘোষণা করেছিলেন। যার মাধ্যমে তার উদ্দেশ পরিষ্কার ছিল। তবে তিনি সব সময় আইনের ভেতরে থেকেই কথা বলতেন। আমার জানামতে, ২৫ মার্চের সন্ধ্যায় ঘোষণার আগে বঙ্গবন্ধু কখনোই সরাসরি বলেননি যে, আমরা আলাদা হব। তবে তার বিভিন্ন কথায় এটা বোঝা যেত আমরা আলাদা, আমাদের স্বাধীন হতেই হবে। তাকে সরাসরি কাছ থেকে দুইবার দেখা ও কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। একবার অনানুষ্ঠানিক বা হঠাৎ করেই। অন্যবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে। প্রথমবার স্বাধীনতার আগে। আমি ১৯৭০ সালে কাজ করতাম মার্কিন সংস্থা কেয়ারে, যারা দুর্যোগে রিলিফ নিয়ে কাজ করত। তখন ময়মনসিংহের কোথাও একটা ঝড়-তুফান হয়েছিল। কেয়ার থেকে আমাকে সেখানে পাঠানো হয় কেয়ারের গাড়িযোগে। পথে যাওয়ার সময় মির্জাপুরের কাছাকাছি পাকুল্লায় বেশ বড় ধরনের ভিড় চোখে পড়ে। খবর নিয়ে জানলাম, শেখ মুজিব (তখনও বঙ্গবন্ধু ঘোষিত হননি) এসেছেন, তাই ৪০ থেকে ৫০ জন মানুষের জটলা। দুপরবেলা, নেচারালি আগ্রহ থেকেই গাড়ি থেকে নেমে কাছাকাছি গেলাম। দেখলাম বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন, তার মাথা সবার উপরে। সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্যরা। তিনি আমাকে দেখলেন, তাকালেন, কাছে ডাকলেন। সম্ভবত তখন গাড়ি খুব একটা ছিল না, কিন্তু কেয়ারের গাড়ি ছিল আমার সঙ্গে, তাই হয়ত নজরে পড়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় কী করি? শুনে উৎসাহ দিয়ে বললেন, ত্রাণের কাজ করা ভালো কাজ। এক-দুই মিনিট কথা হলো, নানা কথা জিজ্ঞেস করলেন। উনারা সবাই তখন পাশের একটি দোকান থেকে টিনের থালায় করে মিষ্টি খাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু আমাকেও মিষ্টি খেতে বললেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা বা আসল দেখা হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে। ১৯৭০ সালে নির্বাচনের পরে আমি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস নামে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের আশায় একটি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু পরীক্ষার ফল আসতে আসতে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতে ফল এলো। পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেকেই পাস করল। কিন্তু এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ শেষ, ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন। সরকারের শুরু তখন। আমাদের সঙ্গে পরীক্ষায় ৭০ থেকে ৮০ জন পাস করেছিল। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, চাকরিটাও প্রয়োজন। আমরা তখন সচিবালয়ে ঘোরাফেরা করছি, চাকরি কীভাবে পাওয়া যায় সে বিষয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করছি। কেউ পরামর্শ দিচ্ছে। আবার অনেকে বকাও দিচ্ছে, তোমরা পাকিস্তানের সময় পরীক্ষা দিয়েছ, ইত্যাদি। তখন সবাই মিলে ঠিক করলাম। বঙ্গবন্ধুর কাছে যেতে হবে। আমি ৭০-৮০ জনের মধ্যে পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম। সবাই বলল, আমি যেহেতু প্রথম হয়েছি তাই আমাকে যেতে হবে, সঙ্গে আরও একজন। ঢাকার যারা ছিল তারা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবে। ফেব্রুয়ারির এক বিকালে, ৫টার দিকে আমরা রমনা গেটের বিপরীতে বঙ্গবন্ধুর তখনকার অফিসে গেলাম। রমনা পার্কের উত্তর দিকে এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রালয়ের ফরেন সার্ভিস প্রশিক্ষণ একাডেমি এটি। তখন সবাই রানির বাড়ি বলত, ১৯৬১ সালে রানি এলিজাবেথ ঢাকায় এসে মনে হয় এই বাড়িতে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন সেখানে বসতেন। আমরা গেলাম, রাস্তা, মাঠ, উঠান, কিছুই খালি নেই। সবার মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম। তখন বঙ্গবন্ধুর সচিব ছিলেন রফিকউল্লা চৌধুরী। তিনি বতর্মান স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর বাবা। উনার কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল। তিনি আমাদের বসতে বললেন। বিকাল ৫টা থেকে অপেক্ষার পর রাত ১১টায় আমাদের সুযোগ এলো। আমরা ভেতরে গিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। দোতলার একটি রুমের দরজা আধা খোলা ছিল। তখন বয়স কম ছিল তাই না বলেই ভেতরে ঢুকে পড়লাম। এখন হয়ত ঢুকতাম না। ভেতরে বঙ্গবন্ধু তখন রুমে পায়চারী করছেন, হাতে পাইপ। আরও দুইজন সঙ্গে ছিলেন, তোফায়েল আহমেদ ও অন্য আরেকজন আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল হক। হঠাৎ আমাদের দেখে বঙ্গবন্ধু আসার কারণ জানতে চাইলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে উনাকে সব বললাম; আমরা পরীক্ষা দিয়েছি, পাস করেছি কিন্তু চাকরি হচ্ছে না। প্রশ্ন করলেন, তুমি কি পরীক্ষা দিয়েছ, কী পাস করেছ? তিনি, সিভিল সার্ভিসের এ পরীক্ষা সম্পর্কে অনেক জ্ঞান রাখতেন, এটা সম্পর্কে তিনি খুবই পরিচিত ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা যেন বেশি করে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে যায়, তা তিনিও চাইতেন। তাকে বললাম, আমরা সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) পরীক্ষায় পাস করেছি, প্রথম হয়েছি। তিনি বললেন, এটাতো ভালো, তাহলে তোমাদের তো প্রয়োজন আছে। তোমরা পড়ালেখা করেছ, পাস করেছ। তাকে বললাম, আমরা তো চাকরি পাচ্ছি না। তখন বঙ্গবন্ধু তোফায়েল আহমেদকে এ সম্পর্কে ব্যবস্থা নিতে বললেন। পরে বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে প্রায় দুই বছর পর আমরা চাকরি পেলাম।

বঙ্গবন্ধুকে আমরা মনেপ্রাণে, চিন্তা ও ধ্যান-ধারণায় স্মরণ করি। যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ ও অনুকরণ করি। বঙ্গবন্ধু কোমল হৃদয়ের কল্যাণকামী মানুষ ছিলেন। বঙ্গবন্ধু মানে বিরাট ব্যাপার, তিনি কোটি কোটি মানুষের নেতা। কোটি মানুষের অন্তরে ও মুখে বঙ্গবন্ধু। এক কথায় বললে, তিনিই তো আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। হাজার বছর ধরেই তো আমরা বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অংশ ছিলাম। বঙ্গবন্ধু কীভাবে সাধারণ মানুষের কল্যাণ হবে এই চিন্তা সব সময় করতেন। স্বাধীন হওয়া খুবই প্রয়োজন। অন্যের কথায় হয়ত সাময়িক আরামে থাকা যায়, আরামে খাওয়া যায়, দিন চলে যায়, কিন্তু আত্মা স্বাধীন হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু আমাদের জাতীয় পরিচয় দিলেন।

লেখক: পরিকল্পনা মন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

সূত্র: আলোকিত বাংলাদেশ

আরও পড়ুন