বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: ক্রীড়নক ও হন্তারকদের মনস্তত্ব

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

আসিফ কবীর: বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা ছিল ‘হাইলি মোটিভেটেড’। মাত্র কয়েক বছর আগেই আমরা গুলশানের ক্যাফে হলি আর্টিজানেও এক ভয়াবহ নৃশংসতা দেখে থমকে গিয়েছিলাম। ২০১৬ সালের পয়লা জুলাই একদল ‘মোটিভেটেড’ জঙ্গি ওই হামলা চালিয়েছিল। ‘মোটিভেশন’ বা মগজ ধোলাইয়ের তীব্রতা ও কুফল বোঝার জন্য হলি আর্টিজানের ওই নৃশংস ঘটনার উদাহরণ নিতে পারি।

পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে থাইল্যান্ডের মার্কিন দূতাবাসে দেনদরবার চালাচ্ছিল খুনিরা। সে সময় হত্যাকারীদের মূল্যায়নে ব্যাংককে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত চার্লস এস হোয়াইটহাউস স্বাক্ষরিত এক তারবার্তায় বলা হয়,

ফারুককে আমাদের কাছে খুবই মোটিভেটেড মনে হয়েছে। তবে রাজনৈতিক চেতনার দিক থেকে সে বেশ বিভ্রান্ত। (২৪৫৩৬ নং প্রতিবেদন)

অবমুক্ত করা মার্কিন গোপন নথির ভিত্তিতে বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ভেঙে যাওয়া দুই পাকিস্তানকে একত্রীকরণে কাজ করছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টে ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার লেফটেনেন্ট কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ তার লেখা ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন- বঙ্গবন্ধু হত্যায় দেশের বাইরের কোন ইন্ধন ছিল বলে তিনি মনে করেন না। (১৬ সংখ্যক (নং) অনুসন্ধান, ১০৮ পৃ:, নবম সংস্করণ, হাওলাদার প্রকাশনী)।

তাহলে দেশের রাষ্ট্রপতি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা সর্বজনমান্য ব্যক্তিকে সপরিবারে হত্যা করতে হবে- এমন চিন্তার শুরুটা কোত্থেকে? এমন ভাবনাই বা মাথায় এলো কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানই এ লেখার মূল লক্ষ্য।

১৫ অগাস্টের পরে হত্যাকারীরা তাদের দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন স্থানে বলেছে, ‘তারা হত্যার উদ্দেশ্যে যায়নি’,  ‘. . . অপ্রস্তুত সৈন্যরা এতে হতভম্ব হয়ে পড়ে’, ‘ . . . শেখ মুজিব আমাদের প্রস্তাবে রাজি হলে ১৫ আগস্টের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত’- ইত্যাদি ইত্যাদি।

আবার জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিষয়ে সাফাই দিয়ে বলেছে, ‘বন্ধ দরজায় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের সময় অন্যদের সঙ্গে সে (শেখ রাসেল, দশ বছর বয়সে শহীদ) মারা যায়।’ (সূত্র: ১৫ই অগাস্ট ১৯৯২ বাংলাবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত ফারুক রহমানের সাক্ষাৎকার)

অর্থাৎ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকা অবস্থাতেও, কোনরকম প্রভাব বা চাপের মুখে না পড়েই- হত্যাকারীদের অন্যতম ফারুক রহমান নিজেদের দায় ঢাকতে এমন কথা বলেছে। কারণ, যতই দম্ভোক্তি তারা করুক, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড যে ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা, সেটি তাদেরও উপলব্ধির বাইরে ছিল না।

বাংলাবাজার পত্রিকা প্রকাশিত ওই একই সাক্ষাৎকারে ফারুক রহমান বলে, “শেখ মুজিবকে সুকর্নর মতো বন্দি করে নির্বাচনের মাধ্যমে নয়া সরকার প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছি, কিন্তু কোন কূল পাইনি।”

তার মানে হলো,

১. বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিত্ব এমনই আকাশ ছোঁয়া এবং প্রবাদ-প্রতীম যে, তাঁকে কারান্তরীণ বা নির্বাসনে পাঠিয়েও প্রতিপক্ষ নিশ্চিত হতে পারত না।

২. যে কোনও উপায়ে বঙ্গবন্ধুর জীবনাবসান ছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় অন্য কারো অধিষ্ঠান দেশের মানুষ মানবে না।

ব্যাংককের মার্কিন দূতাবাস থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা যায়- বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ভেঙে যাওয়া পাকিস্তান একত্র করতে কাজ করছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল ছাড়াও দেশের অনুসৃত মূলনীতি, আদর্শ ও গতিধারার বাঁকবদল এ হত্যা পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

১৯৭৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের ব্লেয়ার হাউসে স্থানীয় সময় বেলা আড়াইটায় কিসিঞ্জার ও ভুট্টোর মধ্যে প্রায় ঘণ্টাখানেক বৈঠক হয়। বৈঠকে কিসিঞ্জারের এক প্রশ্নের জবাবে ভুট্টো বলেন, মুজিব সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে তিনি সন্দিহান। কিসিঞ্জার যোগ করেন, সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করবে। ভুট্টো সহমত প্রকাশ করেন। ভুট্টো এ আলোচনায় বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য চীনের সম্মতি ও উদ্যোগকে স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছি।”

১৯৭৩ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাস থেকে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো রিপোর্টে বলা হয়:

ভুট্টো চীনকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের বাইরে রাখতে (আপাত) সফল হয়েছে। সৌদি আরব ও জর্ডানের মতো ঐতিহ্যগত মিত্র দেশগুলোর পাশাপাশি আলজেরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি মুসলিম দেশগুলোর সাথে পাকিস্তান সম্পর্ক উষ্ণ করছে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, যুদ্ধবন্দি ফেরত ও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার বিলম্বিত করা এ সম্পর্কোন্নয়নের মূল উদ্দেশ্য।

ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেনরি আলফ্রেড বাই রোড ১৮ অগাস্ট এক তারবার্তায় (১৯৭৫ ইসলামা ০৭৫৪৫) লিখেছেন:

একাত্তরে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ ঘোষণার মধ্যদিয়ে যে দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যু ঘটেছিল, তা আবার পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় ইসলামাবাদ আনন্দে উদ্বেল হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন জাগে, মুক্তিযুদ্ধে ‘খেতাবধারী’ যেসব খুনিরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়, তারা পরাজিত পাকিস্তানের চেতনাগত (পাকিস্তানের সাথে কনফেডারেশন গঠন বললেও অত্যুক্তি হয় না) উত্থানের সহযোগী হয় কেমন করে? প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মুক্তিযুদ্ধের খেতাব বাতিল হয়েছে।

১৯৭২ সালে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি ফারুক রহমান অস্ত্র সংগ্রহে যায়। এরপর ১৯৭৩, ১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালেও একাধিকবার ফারুক ও রশিদ মার্কিন দূতাবাসে একই উদ্দেশ্যে যায়। ১৯৭৪ সালের ১৩ মে ফারুক রহমান মার্কিন দূতাবাসের ‘জনসংযোগ কর্মকর্তা’ গ্রেশামের বাসায় উপস্থিত হয়ে জানায়, সে ‘উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার নির্দেশে’ মার্কিন মনোভাব জানতে এসেছে।

এর আগে ১৯৭৩ সালের ১১ জুলাই খন্দকার আব্দুর রশিদ (ফারুকের ভায়রা) মার্কিন দূতাবাসে গিয়ে বলেছিল: (তৎকালীন) ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অস্ত্র সংগ্রহে একটি কমিটি গঠন হয়েছে। তাই সে বিভিন্ন বৈদেশিক মিশন থেকে সমরাস্ত্রের কারিগরি দিক ও দাম জানতে এসেছে।

লক্ষণীয় যে, তখন সেনাপ্রধানের দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহই প্রকৃতপক্ষে অস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন, জিয়াউর রহমান নয়। খন্দকার মোশতাক আহমেদের সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই মার্কিন যোগাযোগ ছিল। জিয়াউর রহমানও তার নিজের মত করে মার্কিন মনোভাব জেনেছিল। এখানে পরিষ্কার বোঝা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকেই বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলে আসছিল। সেক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর খুনিদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা সমালোচনার যেসব ‘তত্ত্ব’ আওড়ানোর প্রয়াস চালানো হয়, সেসব ঢাঁহা মিথ্যা অনায়াসে নাকচ হয়ে যায়।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে যেসব দেশ খুশি ছিল না, খুনিচক্র তাদের পাশে পেতে নানা তৎপরতা চালিয়েছে। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা মোশতাক সরকার এবং বাংলাদেশবিরোধী বিদেশি শক্তিকে পাশে রাখার মধ্য দিয়ে খুনিরা মূলত নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।

ওদিকে মার্কিন সরকার বা দূতাবাস খুনিদের পেশাগত শৃঙ্খলা-পরিপন্থী যোগাযোগ বা অভ্যুত্থান চেষ্টার খবর বঙ্গবন্ধু সরকারকে জানানোর শিষ্টাচার দেখায়নি।

২২ অগাস্ট ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো রিপোর্টে লিখেন:

আমরা বুঝতে পারি যে, রেডিও বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান বর্জন করেছে। ব্যতিক্রমটুকু শুধু এখনো জাতীয় সংগীতেরই বেলায় (যা আইয়্যুব খানও পাকিস্তানি আমলে করেছিলেন)।

অন্যদিকে ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাইরোড ওয়াশিংটনে লিখেন :

জামায়াতে ইসলামীর আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা মওদুদি মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণকে ‘আল্লাহর আশীর্বাদ’ ও ‘ইসলামের বিজয়’ বলেছে। … ১৫ অগাস্টের অভ্যুত্থান হিসাবনিকাশ সমূলে বদলে দিয়েছে। শেখ মুজিব সম্পর্কোন্নয়নে পাকিস্তানের যে আকাঙ্ক্ষাকে তিরোহিত করেছিল, তাকে সঠিক ধারায় আনতে পাকিস্তান এখন ব্যস্ত।

… পাকিস্তান সরকার মনে করে, ১৫ অগাস্টের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ এবং দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো বাংলাদেশের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি ও সমর্থন জানিয়ে যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, খন্দকার মোশতাক আহমেদের কাছ থেকে তার প্রত্যুত্তর পেয়ে তারা সন্তুষ্ট।

সেসময় কলকাতার যুগান্তর পত্রিকা ঢাকার মার্কিন দূত বোস্টারকে মুজিব হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে একটি সংবাদ ছাপায়। ভারত পরোক্ষভাবে বোস্টারকে সিআইএ-র এজেন্ট হিসেবে ইঙ্গিত দেওয়ায় দিল্লী-ওয়াশিংটন সম্পর্কের উষ্ণতা লোপ পায়।

ঢাকা ডেটলাইনে সংবাদটির শিরোনাম ছিল: ‘চিলির আসল খলনায়ক এখন ঢাকায়’; বিবরণীতে বলা, চিলিতে আয়েন্দের বিরুদ্ধে সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর পটভূমি তৈরির সময় (১৯৭৩) বোস্টার ছিলেন সেখানকার মার্কিন দূতাবাসের শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স।

এ প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের ২১ ডিসেম্বর সিআইএ-র একটি রিপোর্টের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়,

সরকার পরিবর্তন হবে এক আকস্মিক আঘাতে। মুজিবের উত্তরসূরি তাঁর দল থেকেই আসবে।

(সিআইএ, এনআইসি ফাইলস, জব ৭৯-আর ০১০১২।)

এতো আগে এমন কথা বলা তখনই সম্ভব, যখন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার শুরু হয়ে যায় এবং সেটা স্বাধীনতা লাভের প্রথম বছরেই দেখতে পাই।

১৯৭৫ সালের ২২ অগাস্ট রাশান প্রাভদা পত্রিকায় এক নিবন্ধে ১৫ অগাস্টের ঘটনার তীব্র নিন্দা করা হয়। প্রাভদায় ‘পর্যবেক্ষক’ ছদ্মনামে প্রকাশিত নিবন্ধে সোভিয়েত অনুসৃত নীতির প্রকাশ ঘটে। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের ওপর শ্রদ্ধাবনত আলোকপাতের পর উল্লেখ করা হয়:

বঙ্গবন্ধুর ও তাঁর পরিবারকে হত্যাকারী ‘কসাইদের’ বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ‘বৈধ আক্রোশ’ (লেজিটেমেট ইনডিগনেশন) ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর বিয়োগান্তক ঘটনায় সোভিয়েত জনগণ তীব্র শোক প্রকাশ করছে।

পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির একদিন পর ১৬ অগাস্ট কলকাতায় মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে বিক্ষোভ হয়। ভারতীয় পত্রপত্রিকা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর প্রকাশ করে। এর কয়েকদিনের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশটিতে সফররত মার্কিন সিনেটর টমাস এফ ইগলটনের কাছে ব্লিৎজ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু হত্যায় সিআইএ-র সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি ‘চাঞ্চল্যকর’ বলে মন্তব্য করেন। মুম্বাইয়ের বামপন্থি সাপ্তাহিক ক্ল্যারিটি ১৯৭৫ সালের ২৩ অগাস্ট প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধের শিরোনাম করে- ‘বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে সিআইএ’।

ভারত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন উদ্যোগ নেয়নি। ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেন বঙ্গভবনে মোশতাাকের সাথে সাক্ষাৎ করে একটি ‘নোট’ ধরিয়ে অনুসরণের জন্য কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে থেকেই চাপ দেন। এ ঘটনাকেই ‘ভারত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে’ বলে প্রপাগান্ডা চালায় মোশতাক সরকার ও বঙ্গভবন।

সেসময় শ্রীলঙ্কা থেকেও মেনে নেওয়া হয়নি মোশতাক সরকারকে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে বলেছিলেন:

আমি রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা কিংবা রাজনৈতিক খুন, বিশেষ করে যাঁরা তাঁদের জাতির জন্য বড় অবদান রেখেছেন তাঁদের হত্যার ঘোরতর বিরোধী। … শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে আমি গভীরভাবে শোকাহত।

সেসময় ‘লঙ্কা সম সমাজ পার্টি’ সরকারের শরিক দলগুলির অন্যতম ছিল। পঁচাত্তরের ১৮ অগাস্ট তারা এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য নতুন শাসকদের সমালোচনা করে। শ্রীলঙ্কার সংবাদপত্র ‘আথাথা’য় একইদিনে ছাপা হওয়া সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশের ঘটনাবলীকে ‘নিষ্ঠুর এবং অমানবিক হত্যাযজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তারা নির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করে- ‘মুজিব উৎখাতের ঘটনায় মার্কিন পিএল ৪৮০ তহবিল অর্থায়ন করে’। পত্রিকাটি মনে করে, ‘বাংলাদেশের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করা ও এখানকার সরকার উৎখাতের সামাজ্যবাদী চক্রান্তের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’

ভুটান ১৫ অগাস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রতিবাদ জানায়

বঙ্গবন্ধুর হন্তারকরা ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর ব্যাংকক পৌঁছায়। তাদের মুখপাত্র ফারুক রহমান সেখানে প্রেসকে বলে:

মেজর জিয়াউর রহমান ঢাকায় পুরো ক্ষমতা দখলের পর (৭ নভেম্বরের পরে) বাংলাদেশে আমার ফেরার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে।

ব্যাংককে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত হোয়াইটহাউস নিজ দেশের পররাষ্ট্র দপ্তরে লেখেন:

আমরা যদি তাদের (খুনিদের) অবস্থানের মেয়াদ বাড়াতে বলি তাতে থাই সরকার ভাববে এই আশ্রয়প্রার্থী হন্তারকদের সাথে বাংলাদেশে আমরাও জড়িত ছিলাম।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার মুখে হেনরি কিসিঞ্জার ২৭৫৮৭৪ নম্বর বার্তায় ব্যাংককের মার্কিন দূতাবাসকে নির্দেশনা দিয়ে বলে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেবে না। ভিসার জন্য আবেদন করলে নিয়ম অনুযায়ী দেখা হবে।

এদিকে পঁচাত্তরের ৬ নভেম্বরে মোশতাকের বদলে বিচারপতি থেকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয় আবু সাদাত মোহাম্মাদ সায়েম। তার (মুখ্য) সচিব মাহবুব আলম চাষী এবং নতুন পররাষ্ট্র সচিব তবারক হোসেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টার ও ডেপুটি চিফ অব মিশনের সাথে ১৭ নভেম্বর কথা বলে। তারা যুক্তরাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের খুনিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। অন্যথা থাইল্যান্ডকে আশ্রয় দিতে অনুরোধ করতে বলে।

অন্যদিকে তবারক হোসেন ঢাকার মার্কিন দূতাবাসকে আরও জানায়- লাতিন আমেরিকার কোন দেশকে রাজি করাতে চেষ্টা করছে তার সরকার।

হন্তারকদের আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে চিঠি দিয়েছিলেন। এদিকে ৬ নভেম্বর বনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী (পরে জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন) জার্মানিকে খুনিদের আশ্রয় না দেওয়ার অনুরোধ জানান। ঢাকার জার্মান রাষ্ট্রদূত মি. রিটার একই সুপারিশ করেন তার দেশকে।

খুনিরা ২৪ নভেম্বর লিবিয়ার বেনগাজি পৌঁছায়। সেখানে খুনি ফারুক এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলে:

আমাদের সরকার ও জনগণ যাদের বিরুদ্ধে (ভারত) লড়াই করছিল, বাংলাদেশ এখন সেসব শত্রুবেষ্টিত। এই সংগ্রামে পাশে দাঁড়াতে ‘মুসলিম ভাইদের’ আহ্বান করি।

ইতিহাসে এটা স্বীকৃত যে, সিআইএ চিলির আয়েন্দের সরকার উৎখাতের জন্য তিনটি গ্রুপকে সমর্থন দিচ্ছিল। কাজেই সন্দেহ জাগে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাটি মুজিব সরকারের উৎখাতে এদেশেও একাধিক গ্রুপকে সক্রিয় রেখেছিল কিনা।

গবেষক ও সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান ১৯৯২ সালে ফারুক রহমানের নেওয়া সাক্ষাৎকারে এমনই একটি ‘লিড’ (আভাস বা তথ্যসূত্র) পান। সেটি হলো- বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সমসাময়িক যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদেশি রাজনীতিক, সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হত্যায় মদদ দেওয়ার অভিযোগে মার্কিন কংগ্রেসই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। এসময় সিআইএ ও এফবিআই-র উদ্দিষ্ট বিষয়ে গোপন তৎপরতার অনুসন্ধানে দুইটি কমিটি গঠিত হয়।

একটির নেতৃত্বে ছিলেন সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চ। এ কমিটি তার প্রধানের নামে ‘চার্চ কমিটি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। অপর কমিটি সিনেট কর্তৃক গঠিত ইন্টেলিজেন্স কমিটি, যার পরিচিতি ‘পাইক কমিটি’ হিসেবে। কমিটি দুটোই আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭৫ সালে। তবে সর্বাত্মক অসহযোগিতার মুখে তাদের কোন সাফল্য নেই।

অবমুক্ত করা মার্কিন নথির নিরিখে বলা যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দেশগুলো বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সময়ে দ্রুত স্বীকৃতি দেয় শুধু ‘ইসলামের’ নামে স্বার্থোদ্ধারকারী নতুন সরকারকে ক্ষমতায় স্থায়ীকরণের আশায়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এ পর্যায়ে আবার বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর কনফেডারেশন গঠনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যবনিকা ঘটা স্বপ্নের পুনরুত্থান ঘটিয়ে যুথবদ্ধ (!) পাকিস্তানের অলীক কল্পনায় বেশ খানিকটা অগ্রসর হয়েও যায় ভুট্টো। নতুন সরকারকে তার পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় এর ইঙ্গিতও মেলে। সেখানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম মনগড়াভাবে উল্লেখ করে সে।

রজার মরিস মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে হেনরি কিসিঞ্জারের স্টাফ অ্যাসিস্টেন্ট ছিলেন। তার একটি মূল্যায়ন এ আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন- কিসিঞ্জার মনে করতেন, বাংলাদেশের ঘটনাবলি তার জন্য একটি ব্যক্তিগত পরাজয়। ট্যাঙ্কে চেপে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর হাভানায় পৌঁছানো এবং কিউবার প্রেসিডেন্ট হওয়া ছিল মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি বড় ধরনের দ্বিতীয় চড়টি খেয়েছিল নির্বাসিত-নির্যাতিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন দেশে মহানায়ক হিসেবে প্রত্যাবর্তন করায়। কিসিঞ্জার ও পররাষ্ট্র অধিদপ্তরের সে-ই জ্বলুনি বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় কমেনি, বরং বাংলাদেশে তাঁর সরকার পরিচালনার সাফল্যে বেড়েছে।

বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পর্ব থেকেই। স্বাধীনতা অর্জনের এক বছরের মাথায় ১৯৭২ সালেই আবার সরকার উৎখাতের চেষ্টার শুরু। সিআইএ-র আগাম ভবিষ্যদ্বাণী ও ভুট্টোর আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য থেকে ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত, সূদুর গ্রোথিত শিকড় এবং সহায়ক অপশক্তিগুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একটি সদ্য স্বাধীন দেশে সহস্র সীমাবদ্ধতা আর সতত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু সরকারকে সমালোচনায় বিদ্ধকারী নিন্দুকরা যে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ছিল, তা বলাই চলে।

জাতির পিতা যখন যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে বাংলাদেশকে নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই ভেঙে যাওয়া দুই পাকিস্তানকে একত্রীকরণের দুরভিসন্ধি নিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে। এই আঘাত শুধু জাতির পিতা বা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে হানা হয়নি, এ আঘাত প্রকৃতপক্ষে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতে কাজ করা ব্যক্তি বা মহল কতটা মানসিকভাবে বিকৃত, নৃশংস ও দুরভিসন্ধিমূলক মনস্তত্বের ছিল তার প্রমাণ, মার্কিন সরকারের কাছে পাঠানো জাতিসংঘের সে সময়ের আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল ড. ভিক্টর এইচ উমব্রিখট এর একটি চিঠি। সুইস নাগরিক উমব্রিখট স্বপ্রণোদিত হয়েই চিঠিতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের খুনিদের আশ্রয় না দেওয়ার জন্য মার্কিন সরকারকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৭ নভেম্বর  তারিখে লেখা ওই পত্রে তিনি লিখেন:

গত বার মাস ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি ঘটেছিল। ভালো খাদ্য পরিস্থিতি, বৃহত্তর খাদ্য মজুদ, ব্যাপক রপ্তানি ও ঘাটতিবিহীন বাজেটও ছিল। ছিল জনহিতকর কর্মসূচি, জনবান্ধব প্রশাসন প্রভৃতি। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সেরা অংশটিকে কেন নির্মূল করা হল, তা উপলব্ধি করা দুরূহ।

অল্প কথার এ চিঠিটি থেকে মূর্ত ও বিমূর্তভাবে, কিংবা বলতে পারি ‘বিটউইন দ্য লাইনস’ এ বুঝতে বাকি থাকে না- বঙ্গবন্ধু ও তার সরকার উৎখাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে কতটা অপরিমিত অন্যায় অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এমনকি বাঙালির এ মহানায়ককে পরিবারের নিষ্পাপ সদস্যসহ হত্যার পরও খুনির দল ও তাদের অনুসারীরা সে অপপ্রচার থামায়নি। অধিকন্তু জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ঘটনায় সমগ্র বাঙালি জাতিকে কী নিদারুণ গ্লানি বহন করে চলতে হয়। ‘খুনিদের দায়মুক্তি’ (!) দেওয়া ঘৃণ্যতম আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের মাধ্যমে হয়তো সে গ্লানি কিছুটা লাঘব হয়েছে।

তথ্য ঋণ: ওয়েবসাইটে অবমুক্ত মার্কিন গোপন নথি; মিজানুর রহমান খান, মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড; উইকিলিকস।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাংবাদিক হুমায়ূন কবীরের বড় সন্তান।

সূত্র: বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম

আরও পড়ুন