মধুমতীর ফিরে আসা

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে আসার দিনটি মুজিবের জীবনের সম্ভারে সুগভীর সঞ্চয়। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতায় জীবনের দিন কেটেছে, তার কোনো কিছুই বিলুপ্ত হয়নি। স্মৃতির ঘরে সঞ্চিত হয়ে আছে। পাকিস্তানের জেলখানা ছিল এই সঞ্চয়ের আর একটি দিক। তিনি নিজেও ভেবেছেন কবে একদিন এখান থেকে ফেরা হবে বাংলার মাটিতে। বাংলার মাটি তাঁর মাটি, এই ভাবনা অনবরত তাঁকে স্থির রাখে। গভীর স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে এই ভাবনা থেকে। কারণ আর কোনো মাটির সঙ্গে মুজিবের নাড়ির টান নেই। এটা তাঁর বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত।

সেদিন বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বাড়িতে আসা হয়নি। লাখ লাখ মানুষের দাবিতে রেসকোর্স ময়দানে যেতে হয়েছে। রমনা রেসকোর্সে বক্তব্য দিয়ে লাখ লাখ মানুষের চোখের কোনা ভিজিয়ে বেরিয়ে এসেছেন ভালোবাসার সুগন্ধি বুকে নিয়ে। এত মানুষের ভালোবাসা তাঁকে জীবনের এই বয়স পর্যন্ত আপ্লুত করে রেখেছে। বাংলার মাটিতে ধ্বনিত হয় তাঁর প্রাণপ্রিয় গণমানুষের হৃদয়ের স্পন্দন। ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। বীর বাঙালি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। দেশের মানুষকে নতুন করে বোঝা হলো তাঁর। মানুষের কাছে স্বাধীনতাসংগ্রামের সাহসী চেতনার জন্য স্যালুট করে নেমে এলেন মঞ্চ থেকে। চারদিক থেকে ফুল আর ফুলের মালায় ভরে যায় শরীর। যতটা সম্ভব দুহাতে জড়িয়ে রাখেন। ফুলের মাঝে ভেসে ওঠে রেণুর মুখ। এই সব ফুল আজ তাঁর সামনে রেণুর ভালোবাসার দৃষ্টি। তাঁর দৃষ্টিতে লেগে থাকে ফুলের সুষমা। মুখে বলেন, ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখা জীবনের মানুষ তুমি। তুমি আমার মধুমতী, সেই সঙ্গে হাজার রকমের ফুল। তুমি আমার রং আর সুবাসের জীবন।

—মুজিব ভাই গাড়িতে ওঠেন। অনেকে একসঙ্গে কথা বলে।

শত শত ফুলের মালা শরীরে জড়িয়ে তিনি ফিরে আসেন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে। দীর্ঘ ৯ মাস এই বাড়ির বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। কিছুক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকেন মুজিব। মনে হয় এ বাড়ি আজ তাঁর সামনে এক নতুন ভুবন।

তাঁর সঙ্গে আসা রাজনৈতিক কর্মীদের অনেকেই বলে, আমরা এখন যাই মুজিব ভাই। আপনি এখন বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিন।

—হ্যাঁ, সবাই ঘরে যাও। তোমরা সুস্থ থাকো, ভালো থাকো। কালকে আবার দেখা হবে।

মুজিব সবার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়েন। অল্পক্ষণে রাস্তা খালি হয়ে যায়। লেকের ওপর থেকে স্নিগ্ধ বাতাস উড়ে আসে। বুক ভরে শ্বাস টানেন তিনি। মাকে পেছনে রেখে পাঁচ ছেলে-মেয়ে এগিয়ে আসে। সবার দিকে তাকিয়ে বুক উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। রাসেলকে কোলে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন। হাসিনা, রেহানা, কামাল, জামাল তাঁকে ঘিরে ধরে।

—আব্বু, আব্বু, আপনি কেমন আছেন?

—ভালো আছি রে সোনামানিকরা। তোরা কেমন আছিস?

ওদের কাছ থেকে উত্তর না শুনে আবার বলেন, ভালো আছি রে। তোদেরকে দেখে আরো ভালো হয়ে গেছি।

তিনি গেট ঠেলে ভেতরে ঢোকেন। দেখতে পান রেণু ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কোল থেকে রাসেলকে নিচে নামিয়ে দেন। হাসিনা সবাইকে বলে, চল আমরা ওপরে যাই। আব্বার জন্য নাশতা রেডি করি। লাফাতে লাফাতে সবাই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যায়। বলতে থাকে, আব্বু এসেছে, আব্বু এসেছে। জয় হোক আব্বুর, জয় হোক আব্বুর। আব্বুর জয় হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে।

হাততালি দিতে দিতে ওরা ওপরে উঠে যায়।

প্রিয়তমা রেণু অপূর্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। বলতে চান হৃদয়ের কথা। কিন্তু বলা হয় না। দৃষ্টির আভার বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে রাখেন চারদিকে। মুজিব জানেন এই তাকিয়ে থাকা তাঁর ভালোবাসার গভীর প্রকাশ। জয় করে নেন হৃদয়ের সবটুকু। বর্ষার পলিমাটি যেভাবে উর্বর হয়ে উঠে ফসলের প্রাচুর্যে ভরিয়ে দেয় প্রান্তর, তেমনি সবুজ প্রাণময় উচ্ছ্বাস হৃদয়ের মাঠভরা ফসলের সম্ভার। জীবনের সবটুকু ভরে রাখে ভালোবাসার ফসল। আশ্চর্য রেণুর দৃষ্টি। কৈশোর থেকে তিনি এই দৃষ্টি দেখেছেন। ৯ মাস পরে জেলখানা থেকে ফিরে এসে মুজিব বুকভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে হাত রাখেন রেণুর কপালে, যেন বাংলার প্রান্তর ওই কপাল, ওখানে রাজনীতির সবটুকু অর্জন জমাট হয়ে ফসলের মাঠ হয়ে আছে। এই মাঠ এভাবে সবাই পায় না। মুজিবের পাওয়া ভিন্নতর ব্যতিক্রমী সম্ভার। রেণু তাঁর শুধু জীবনসঙ্গী নন, তিন বছর বয়স থেকে রেণু তাঁর রাজনীতির সচলতার প্রিয়তম সঙ্গী। এমন একজন অপরূপ সঙ্গী জীবন জিজ্ঞাসার সবটুকু মণিমাণিক্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। রেণুকে কোনোভাবেই এখান থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। রেণু তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো মণিমাণিক্যের একত্র সমাহার।

রেণু বলেন, চলো ঘরে যাই। ছেলে-মেয়েরা সব ওপরে গেছে। ওরা তো আজকে মহাখুশি যে বাবা ফিরে এসেছে।

—তা তো হবেই। তুমিও হয়েছ। তোমার ভালোবাসার মধুমতী নদী ফিরে এসেছে তোমার বুকে। এ ছাড়া তোমার ভেতরে সবুজ প্রকৃতি, ফসলের ক্ষেত সব কিছু আছে। পাখপাখালির কূজনে তুমি আমার গান মায়াবতী রেণু।

—আর তুমি আমার মধুমতী নদী। তোমার মাঝে সাঁতার কেটে আমি নিজেকে ভরিয়ে রাখি। তোমার জলে ডুবে গিয়ে আমার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হতে দেখি। আমার কোনো কষ্ট নাই। তোমার জেলখানায় থাকার দিনগুলোও আমাকে মধুমতী নদীতে ডুবিয়ে রাখে। এ জন্য তুমি আমার কাছ থেকে দূরে থাকতে পারো না। মধুমতীর পানি আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। সে জন্য ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি তোমার দুহাত মধুমতী নদী। আমার মন খারাপ হলে তা ধরে রাখি না, ভেসে যায় নদীর স্রোতে। তোমাকে দেখতে পাই ঘরের সবখানে। তুমি আমার প্রাণের মধুমতী। তুমি দেশের জন্য যা কিছু করো তা আমি নিজের ভেতর সতেজ করে রাখি। এই সব ভাবনার মাঝে আমার দিন ফুরোয় না। একজন মানুষ দেশ নিয়ে এত কিছু ভাবতে পারে, তুমি ছাড়া আর কাউকে তো এমন করে দেখি না।

মুজিব হাসতে হাসতে বলেন, চলো ওপরে যাই। ছেলে-মেয়েরা অপেক্ষা করছে। ওরা ভাববে মা-বাবার কী হলো।

—মা-বাবা প্রেমের কথা বলছে। ওরা যা ভাবে ভাবুক। ওদের ভাবনায় আমাদের জীবন ধন্য হবে।

সিঁড়ির ওপর থেকে হাসিনা ডাকে, মা খাবার রেডি করেছি। ওপরে আসুন।

দুজন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠেন। মুজিব রেণুর হাত ধরেন। রেণুর মনে হয় ভালোবাসার মধুমতী তাঁকে জড়িয়ে রেখেছে। যেখানেই থাকুক, দুজনের ভালোবাসার অদৃশ্য মায়াজাল দুজনকে পূর্ণ চাঁদের উজ্জ্বল জ্যোত্স্নায় ছায়ার মতো স্নিগ্ধ রাখে।

দোতলায় উঠে মুজিব বাথরুমে যান। দেশের পানিতে স্নান করে নিজের পুরো শরীরের দিকে তাকিয়ে বলেন, আমি এখন বুড়িগঙ্গা নদী। পানি গড়াচ্ছে শরীর বেয়ে। আহ, কী শান্তি!

বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলে রেণু বলেন, তোমাকে তোমার মাটিতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। তুমি ধুয়ে ফেলেছ পাকিস্তানের জেলখানার সব কিছু। বাংলার মাটি তোমার মাটি—তোমার শরীর সেটাই দেখাচ্ছে। তুমি যেখানে ছিলে, অনায়াসে তা ঝেড়ে ফেলেছ।

ছেলে-মেয়েরা মায়ের কথা শুনে হাসতে থাকে। হাসিনা বলে, তুমি কিছু খেয়ে নাও আব্বু। তারপর রেস্ট করতে যাও।

—হ্যাঁ, দে মা।

—ডাইনিংটেবিলে দিয়েছি। তুমি আর মা খাও। আমরা নিচে যাই আব্বু। লেকের পারে হেঁটে আসি।

মুজিব কিছু বলার আগেই ছেলে-মেয়েরা চলে যায়। ধুপধাপ করে সিঁড়ি দিয়ে নামে। হাসিনার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, আব্বু এসেছে আমাদের বাড়িতে আনন্দের জোয়ার এসেছে। লেকের ওপর থেকে বাতাস ভেসে আসছে।

রেণু বলেন, ওরা আমাদের একা থাকার সুযোগ দিল।

মুজিব হাসতে হাসতে বলেন, এ সবই ছেলে-মেয়েদের ভালোবাসা। তোমাকে ওরা ভিন্ন চোখে দেখে। তুমি যে আমার জন্য কত কষ্ট সহ্য করো, এটা ওরা বোঝে। এ বোঝায় ওরা জীবন সার্থক করে।

রেণু নিজেও হাসতে হাসতে বলেন, তোমার জন্য আমার কোনো কষ্ট নেই। তুমি আমার জীবনের সবটুকু ধরে আছ। স্বাধীন দেশে তুমি ফিরে এলে এর চেয়ে কোনো বড় গর্ব কি আমার হতে পারে!

রেণুর ঝকঝকে দৃষ্টিতে অভিভূত হন মুজিব। হাসতে হাসতে বলেন, তোমার ভালোবাসায় ডুবে থেকে আমি দেশের জন্য কাজ করতে পেরেছি। দুঃখী মানুষদের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছি। সবখানে তুমি আমার পাশে ছিলে রেণু। যে ঘর-সংসার আমি দেখতে পারিনি তুমি তা দেখে আমার পথকে মসৃণ করে দিয়েছ। তোমার কাছ থেকে আমি কোনো বাধা পাইনি। কোনো কষ্ট পাইনি।

মুজিব উঠে দাঁড়ান। রেণুও দাঁড়িয়ে বলেন, আমার ভালোবাসা—ভালোবাসা বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

মুজিব প্রখর দৃষ্টিতে রেণুকে দেখেন। রেণু মুজিবের বুকে মাথা ঠেকান। দুজনের শৈশব থেকে শুরু হওয়া একত্র জীবনের সবটুকু দুজনের প্রখর অনুভবের স্বপ্নছায়া হয়ে ভরে আছে। দুজনের ভালোবাসা বয়ে যায় অনন্ত সময়ের পথে। দুহাতে রেণুকে জড়িয়ে রাখেন মুজিব। ঘরের ভেতর বয়ে যায় ভালোবাসার মধুমতী নদী।

লেখক : সেলিনা হোসেন, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যক
কালের কণ্ঠ ৮ আগস্ট, ২০২ লিঙ্ক

আরও পড়ুন