বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

অনেক সূর্যসন্তানের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। কারণ, তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি বাঙালি জাতির জনক। তিনি বাংলাদেশ নামক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের মহান স্থপতি। তাঁর জন্ম হয়েছিল বলেই বাংলাদেশ আজ স্বাধীন রাষ্ট্র। আর সেই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলতে পারছি।

বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুজ্জ্বল ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর নাম।

কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন বঙ্গবন্ধু। তিনি সংযুক্ত ছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। তাঁর রোল নম্বর ছিল ১৬৬।

শেখ মুজিবুর রহমান সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র হলেও তিনি বেশির ভাগ সময় আড্ডা দিতেন ফজলুল হক মুসলিম হলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে তিনি অধিকাংশ সময় কাটাতেন ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে। ১৯৪৪ সাল থেকে এই বাড়িতেই শামসুল হক, কামরুদ্দিন, তাজউদ্দীন প্রমুখ নেতার আনাগোনা ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের শেষভাগে ঢাকায় এসে এই নেতাদের সঙ্গে যুক্ত হন। বাড়িটির নাম ছিল পার্টি হাউজ। পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এখান থেকেই শুরু হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই শেখ মুজিবুর রহমান যুব আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি ছাত্র-আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্র নেতাদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করেন।

১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। কারাগার থেকে বের হয়ে শেখ মুজিবুর রহমানসহ তরুণ নেতৃবৃন্দ পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। গড়ে ওঠে আন্দোলন।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৯ সালে আইন বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যে দাবি-দাওয়া নিয়ে অসন্তোস চলছিল। কর্মচারীদের মাসিক বেতন ছিল নগণ্য। তাঁদের থাকার জন্য কোনো বাসস্থান ছিল না।

১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ থেকে কর্মচারীরা ধর্মঘট শুরু করেন। কর্মচারীদের ধর্মঘটের সমর্থনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ ৩ মার্চ ক্লাস বর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বানে ৫ মার্চ পূর্ণ ছাত্র ধর্মঘটের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে বেলা ১২টায় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বলা হয়, কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া কর্তৃপক্ষ যত দিন মেনে না নেবে, ততদিন সহনুভূতিসূচক ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।

শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রনেতা ও যুবকর্মী হিসেবে কর্মচারীদের আন্দোলনকে শুরু থেকেই সমর্থন করে আসছিলেন। শুধু তা-ই নয়, একসময় তিনি এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। শেখ মুজিবুর রহমনের নেতৃত্বে সে সময় অন্যদের মধ্যে নঈম উদ্দিন আহমেদ, মোল্লা জালাল উদ্দিন, আবদুস সামাদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, কল্যাণ দাশগুপ্ত, নাদেরা বেগম, অলি আহাদ, দবিরুল ইসলাম প্রমুখ এই আন্দোলনে জড়িত ছিলেন।

প্রাদেশিক সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই আন্দোলন ভন্ডুল করার জন্য ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। ১৯৪৯ সালের ২৬ মার্চ ২৭ জন ছাত্র-ছাত্রীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। ৬ জনকে ৪ বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। ১৫ জনকে আবাসিক হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একজনকে ১০ টাকা জরিমানা করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৫ জনকে ১৫ টাকা করে জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া তাঁদের মুচলেকা দিতে বলা হয়। অনাদায়ে ছাত্রত্ব বাতিল। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্বান্তের প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের ২০ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে হরতাল ও অবস্থান ধর্মঘট ডাকা হয়। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার অবস্থায় তাঁকে ছাত্রত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য জরিমানা ও মুচলেকা দিতে বলা হয়। তিনি মুচলেকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন।

পরবর্তী সময় নিজ যোগ্যতায় শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতায় পরিণত হন। জাতীয় নেতা হয়ে গেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়নি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল।

শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়ায় পাকিস্তান সরকার। তিনিসহ ৩৫ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফুঁসে ওঠে বাঙালি। তীব্র আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার নতিস্বীকার করে। মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য আসামিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার। শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণের বন্ধু।

১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনার রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপধিতে ভূষিত করা হয়।

আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বাঙালির সামনে হাজির হয় ১৯৭১ সাল। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এ দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তির সংগ্রামে। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে আসেন।

১৯৭২ সালের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আসেন। কলাভবনের সামনে বটতলায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁকে ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ দেওয়া হয়। সংবর্ধনা সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর সামনে তাঁর ছাত্রত্ব বাতিলের আদেশের কপি ছিঁড়ে ফেলা হয়।

স্বাধীনতার পর দেশে খাদ্য সংকট চলছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হলে এক বেলা ভাত ও এক বেলা রুটি দেওয়ার সিদ্বান্ত নেয়। কিছুদিন পর ছাত্ররা দুই বেলা ভাতের দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুজাফফর আহমেদ চৌধুরীকে ঘেরাও করে। বঙ্গবন্ধু প্রটোকল ছাড়াই উপাচার্যের বাসভবনে চলে আসেন। দুই বেলা ভাতের ব্যবস্থার আশ্বাস দেন তিনি। ছাত্ররা ঘেরাও প্রত্যাহার করে নেয়।

১৯৭২ সালের শেষভাগে ছাত্ররা অটোপ্রমোশনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কিছু শিক্ষককে ঘেরাও করে। বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্ত্বশাসন দেন বঙ্গবন্ধু। জারি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে এসেছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আমন্ত্রণটি সাদরে গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর।

বঙ্গবন্ধুকে বরণ করার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জাতির জনক আসবেন বলে সাজে পুরো ক্যাম্পাস। সবার মাঝে উৎসবের ভাব। বঙ্গবন্ধুর আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে একদল বিপদগামী সেনা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বাঙালি চিরতরে হারায় তাদের মহান নেতাকে। থমকে যায় ইতিহাস।

২০১০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে সিন্ডিকেট সভায় বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার মহান সন্তান বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি নানাভাবে ধরে রেখেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর আগমন উপলক্ষে তাঁর জন্য একটি চেয়ার তৈরি করা হয়েছিল। সেই চেয়ারটি যত্ন করে রেখে দেওয়া হয়েছে। সেদিন বঙ্গবন্ধুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি মানপত্র দেওয়ার কথা ছিল। মানপত্রটি ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালে হলটির নাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান করা হয়। ১৯৯৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে বঙ্গবন্ধু চেয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ স্মরণে ২০১৮ সালে রোকেয়া হলে ৭ মার্চ ভবন উদ্বোধন হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু টাওয়ার।

লেখক: সাদি ইসলাম জয়, সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা টাইমস, ০২ জুলাই ২০২০ লিঙ্ক

 

আরও পড়ুন