টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট খোকাই বাঙালির মহানায়ক

সম্পাদনা/লেখক: Zakir Hossain

টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট খোকা। অজপাড়া গাঁয়ের গ-ি পেরিয়ে যিনি একদিন হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির প্রিয় নেতা, মুক্তির আলোকবর্তিকা, সাড়ে সাত কোটি মানুষের মহানায়ক। সেই মহানায়কের কৈশোর কেমন ছিল? কেমন ছিল তার ছেলেবেলার স্কুল? কেমন ছিল তার খেলার মাঠ? কেমন বাড়িতে মহানায়কের জন্ম বেড়ে ওঠা? সেই গল্পই জানিয়েছেন মহানায়ককে কাছ থেকে দেখা টুঙ্গিপাড়ার তার অগ্রজ-অনুজ পাড়া প্রতিবেশী ও স্বজনরা।

বঙ্গবন্ধুর আদি পৈতৃক বাড়িটি মোঘল স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত। বহু বছর আগে শেখ বোরহান উদ্দিন নামে এক ধার্মিক পুরুষ টুঙ্গিপাড়ার মধুমতি নদীর তীরে শেখ বংশের গোড়াপত্তন করেন। তারই বংশধর জমিদার শেখ কুদরত উল্লাহ মোঘল আমলে এ বাড়িটি নির্মাণ করেন। ইতিহাস আর ঐতিহ্য মাথায় নিয়ে কালের সাক্ষী হয়ে সেই বাড়িটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার এই বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ঐতিহ্যবাহী শেখ পরিবারের ছোট্ট শিশু মুজিবের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সাহেরা খাতুন আদর করে ডাকতেন ‘খোকা’ বলে। শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের অনেকটা সময় তিনি কাটিয়েছেন এই বাড়িতে।

বাড়ি থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে জিটি মাইনর স্কুল। প্রতিদিন পায়ে হেঁটে এ স্কুলে যাতায়াত করত ছোট্ট খোকা। এ স্কুলে তার প্রিয় সহপাঠী ছিল মানিক, ছহিরুদ্দিন, গেদু মিয়া। তাদের সঙ্গে মিলে স্কুলের সকল কাজের নেতৃত্বে ছিল খোকা। স্কুলের ক্লাসের ফাঁকে বন্ধুদের নিয়ে আম গাছে চড়ে আম পাড়া জিটি স্কুল ঘিরে কত শত স্মৃতিকথা মানুষের মুখে মুখে।

নদীতে সাঁতার কেটে বড় হওয়া খোকা বাড়ির পাশে তালাবের মাঠে বিকাল হলে ফুটবল নিয়ে বেরিয়ে পড়ত। ফুটবল, হাডুডু ও ভলিবল খেলতে ভীষণ ভালোবাসতো সে। জিটি স্কুলের ক্লাসের ফাঁকে অথবা ছুটির পরে বিদ্যালয়ের মাঠে ফুটবল খেলতো কিশোর খোকা। রাজনীতির মতোই খেলার মাঠেও ছিল শেখ মুজিবের একচ্ছত্র আধিপত্য। শারীরিক উচ্চতা বেশি হওয়ায় হেড দিয়ে গোল দিতে ছিল ভীষণ পারদর্শী। এছাড়াও গ্রামীণ ঐতিহ্যের লাঠিখেলা দেখতে ভীষণ ভালোবাসতো সে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ভেতরে প্রবেশের জন্য ছিল বিশাল এক কাঠের দরজা। সে সময় বাড়িটির ভেতরের চার ভিটায় ছিল ছোট ছোট ইটের দ্বারা তৈরি চকমিলান চারটি ভবন। সময়ের বিবর্তণে তিনটি ভবনই এখন আর নেই। তবে বাড়ির সম্মুখভাগের যে ভবনটি এখনো বিদ্যমান, সেটি তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। তারা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত বাড়িটির পুরনো আদল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এই বাড়ির প্রাচীন এ শৈল্পিক সৌন্দর্যের মাঝে যেন প্রতিনিয়ত বঙ্গবন্ধুকেই খুঁজে ফেরেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা।

শেখ বাড়ির সদস্য শেখ বোরহান উদ্দিন বলেন, টুঙ্গিপাড়ার এ বাড়ির আঙিনায়ই ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধু তার খেলার সাথীদের নিয়ে খেলেছেন নানা খেলা। গ্রামের লোকদের সঙ্গে তিনি গোল্লাছুট, বুড়ি-চি, দাঁড়িয়া-বাঁধা খেলেছেন। এমন বহু স্মৃতি রয়েছে বঙ্গবন্ধুর এ বাড়ির আঙিনায়। রয়েছে তার সেইসব স্মৃতিময় স্থানগুলো।

বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও একই স্কুলে পড়া শেখ আবদুল হামিদের কাছে এখনো জ্বলজ্বলে সেসব স্মৃতি। তিনি বলেন, মুজিব এই স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলত। দেহের গড়ন লম্বা হওয়ায় মাথা দিয়ে হেড দিত সে। তার মাথা থেকে বল কেউ নিতে পারত না। একবার ক্লাসের এক ছেলের গায়ে জামা না থাকায় বাড়ি যাবার পথে নিজের জামা খুলে দিয়েছিল সে। তার মতো উদার মনের মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।

তিনি আরো বলেন, একবার এলাকায় ভীষণ অভাবের সময় বাড়ির ধানের গোলা থেকে বাবার অলক্ষে সবাইকে ধান দিয়েছিল খোকা মানে শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন পাটগাতীর মরহুম সৈয়দ নুরুল হক মানিক মিয়া। পড়তেন একই ক্লাসে। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে মানিক মিয়ার কথা লিখেছেন, ‘মানিক আমার আবাল্য বন্ধু।’ মানিক মিয়ার ছেলে সৈয়দ বদরুল হাসান বলেন, আমার বাবা একবার টুঙ্গিপাড়া থেকে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। বঙ্গবন্ধু তখন প্রধানমন্ত্রী। নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে ঢুকতে দিলেন না। বাবা তাই অভিমানে ফিরে আসার জন্য উদ্যত হলেন। দোতলা থেকে বঙ্গবন্ধু দেখলেন, তার বন্ধু মানিক হতাশা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি নিরাপত্তারক্ষীদের ডেকে দ্রুত বাবাকে নিয়ে আসতে বললেন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হলো বঙ্গবন্ধুর কাছে। বাবা তখনো রেগে আছেন। রাগী কণ্ঠেই বললেন, তোর কাছে আর আসব না। বঙ্গবন্ধু সব বুঝলেন। পাশে রাখা কাগজ টেনে তাতে গজগজ করে লিখে বন্ধু বাবার হাতে দিলেন। তাতে লেখা, ‘মানিক যখনই আসিবে তখনি দেখা করিবে শেখ মুজিব।’

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি-সম্বলিত এ বাড়িটি দেখতে প্রতিনিয়ত ভিড় করেন হাজারও দর্শনার্থী। বাড়িটির শৈল্পিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন সবাই। তারা এখানে এসে এ বাড়ির ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন। লক্ষ্মীপুর থেকে আসা দর্শনার্থী হাফিজুর রহমান বলেন, এ বাড়িটি দেখতে পেয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত। আমি এ বাড়ির প্রতিটি ইটের মাঝে বঙ্গবন্ধুর ছোঁয়া অনুভব করেছি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হান্নান মিয়া বলেন, জাতির পিতার পৈতৃক বাড়িটি আমরা হুবহু আগের রূপে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ কাজ করতে আমরা শুধু চুন-সুরকি ব্যবহার করেছি। আধুনিক সিমেন্টের ব্যবহার করিনি।

প্রকাশিত: মার্চ ১৭, ২০২০  | পাপিয়া সুলতানা

Source: Bhorerkhagoj Link

আরও পড়ুন