স্মৃতিতে ভাস্বর বঙ্গবন্ধু

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন এলে আমাকে স্মৃতি ভীষণ তাড়িত করে। কেননা আমি এমন এক মহাপুরুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি যা কল্পনা করা যায় না। আমি নিজে অশ্রুসিক্ত হই এই ভেবে কি করে সেনাবাহিনীর কিছু সংখ্যক উচ্ছৃঙ্খল সদস্য চেইন্‌ অব কমান্ড ভেঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলো। যিনি একটি দেশ ও একটি পতাকা দিয়ে বাঙালিকে বিশ্বে পরিচয় করিয়েছেন।
ছোট বেলায় আমাদের বাসায় ও গদিতে ৩৯-৪১ রামজয় মহাজন লেইনে যাওয়া-আসার কথা আমার ঠিক মনে নেই। কিন্তু ঠাকুরমা ও মা’র কাছ থেকে শুনেছি বাসায় অনেকবার এসেছেন। আমার বুদ্ধিতে উনাকে প্রথম দেখা ৭০ সালের ২২ নভেম্বর প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ববঙ্গ লণ্ডভণ্ড। লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটলে বঙ্গবন্ধু সচক্ষে ক্ষয়ক্ষতি দেখতে ও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চট্টগ্রামে আসেন। এসময় তিনি বোয়ালখালী উপজেলায় আসবেন শুনে পশ্চিম পটিয়া ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে উনাকে ফুলের মালা দেওয়ার জন্য একটি মিছিল নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আগরতলা মামলা চলাকালে ৬৮-৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু ও (বাবা) মানিক চৌধুরী’র মুক্তির দাবীতে প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে পাঁচরিয়া দিঘি ও সেনের হাটে শ্লোগান দিতাম জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, রাজবন্দীদের মুক্তি চাই দিতে হবে, আরো শ্লোগান হতো আইয়ুব তোমার মিথ্যা মামলা কোথায় গেলো কোথায় গেলো অবশেষে জনতার জয় হলো। আইয়ুব-মোনায়েম ভাই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। অবশেষে ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে মুক্তি পেলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা মামলার অভিযুক্তরা। স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে আমি সেই মিছিলের সঙ্গে গোমদন্ডী যাই। সেই মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আবদুল হক, নুরুল ইসলাম (মনসা), ডা. হাসান, রফিক আহমদ সহ ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ। বঙ্গবন্ধুকে গোমদন্ডী ফুলতলে মালা দেওয়ার সময় আজিজ চাচা (এম.এ আজিজ) আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলে বঙ্গবন্ধু আমাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে এবং তাঁর গাড়িতে উঠিয়ে সঙ্গে করে হাজির হাটের পর মুন্সির হাটে একটি সভায় বক্তৃতা দিয়ে তিনি আমাকে শহরে নিয়ে আসেন।
তখন আমার বাবা (মানিক চৌধুরী) ইয়াহিয়া খানের সামরিক আইনে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করছেন। সেদিন বিকেলে শহরের মুসলিম হলে একটি ঘরোয়া কর্মী সমাবেশে যোগ দেন বঙ্গবন্ধু। সেখানে ভাষণদান কালে সামরিক কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্যে বললো, আমার ভাই মানিককে কেনো গ্রেফতার করা হলো জানতে চাই? আমি অবিলম্বে তার মুক্তি চাই। এসময় সভাস্থলে শ্লোগান উঠে মানিক চৌধুরী’র মুক্তি চাই। এর কিছুদিন পর বাবা মুক্তি পান। ’৭০ এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন হয়। পাকিস্তানী সামরিক চক্র এ নির্বাচনকে মেনে নিতে পারেনি। অতঃপর মুক্তিযুদ্ধ ও ’৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক বিজয়। দেশ স্বাধীন হলো। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর সাথে বাবার (মানিক চৌধুরী’র) সম্পর্ক ছিলো পরিবারের সদস্যের মতো। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর ৩২নং বাসায় ও গণভবনে অনেকবার গিয়েছি সাক্ষাৎ করতে। তখন বঙ্গবন্ধুর সহকারী একান্ত সচিব ছিলেন প্রয়াত ঢাকার মেয়র মো: হানিফ (চাচা)। উনার নাজিরা বাজার বাসা থেকে ভঙওয়াগন গাড়িতে করে গণভবনে যেতাম। রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও গণভবনে আমি দেখেছি শ্রমিক ফেডারেশনের লুঙ্গি ও পাঞ্জাবী পরা আবুল বশর সাহেব বসে আছেন। কমিউনিস্ট পার্টির মনি সিংহ, ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সহ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে। একবার আমার ঠাকুরমাকে নিয়ে আমার কাকা প্রয়াত অমর চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন। বঙ্গবন্ধু চেয়ার থেকে উঠে ঠাকুরমাকে বসিয়ে কথা বললেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও প্রবীণদের প্রতি উনার শ্রদ্ধাবোধ দেখে অভিভূত হলাম। ১৯৭৫ সালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে বঙ্গবন্ধু সরকারের পাটমন্ত্রী ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত শামসুল হক সাহেব মুজিব নগর সরকারে উপসচিব ডা. আহমেদ আলী, হুমায়ুন ভাই (শামসুল হক সাহেবের বড় ছেলে) ও আমি একসাথে গাড়িতে করে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ৩২নং ধানমন্ডিতে যাই। হুমায়ুন ভাই গাড়িতে বসে রইলেন শামসুল হক কাকু তাঁকে ডাকলেন যাওয়ার জন্য তিনি গেলেন না আমরা তিনজন গেলাম ৩২নং নীচতলাতে। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে চুম্বন খেলেন। সেই স্মৃতি এখনো ভুলতে পারিনি। কামাল ভাই (শেখ কামাল) গেইটে দাঁড়িয়ে স্কুল ছাত্র-ছাত্রী ও যারা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আসছেন তাদের দেখাশুনা করছেন। তাঁর হাসিমাখা মুখটা খুবই মনে পড়ে।
আজ মনে মনে ভাবি যাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশটির জন্ম হতো না। যাঁর জন্ম না হলে বাঙালির কোনদিন পাসপোর্ট হতো না, বাঙালি কখনো সেনা প্রধান, নৌ প্রধান, বিমান প্রধান, সচিব, ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি, শিল্পপতি হতেন না বরং পাকিস্তানীদের দাস হয়ে থাকতেন। উনার অবদানে একটি মানচিত্র ও একটি পতাকা। তাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন বঙ্গবন্ধু যেখানে ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে অথবা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত কিংবা কঙবাজার সমুদ্র সৈকতে একটি সুউচ্চ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হোক, যেটি পরিচিতি লাভ করবে Statue of Independence। পরিশেষে প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়ের সেই কবিতাটি উল্লেখ করে আমি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই-
‘যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান,
ততকাল রবে কীর্তি তোমারশেখ মুজিবুর রহমান।’

দীপংকর চৌধুরী কাজল | লেখক : সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মী

সূত্র: দৈনিক আজাদী লিঙ্ক  । সোমবার , ৯ মার্চ, ২০২০

আরও পড়ুন