ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

বাঙালি জাতীয়তার চেতনাকে ধ্বংস করার নীল নকশার অংশ হিসেবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়কর্মী হিসেবে বাংলার জনগণের কাছে পরিচিতি লাভ করা তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দেন। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা এবং বাঙালি ছাত্রসমাজকে দেশপ্রেমের চেতনায় শানিত করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

সাতচল্লিশে দেশবিভাগের এক বছরের মধ্যেই বাঙালি জাতি ভাষার স্বাধিকার আন্দোলনে নেমেছিল। বায়ান্ন সালে মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা সংরক্ষণের জন্য এ জাতির বীরসন্তানেরা জীবন উৎসর্গ করেছিল। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এই জাতির প্রকৃত ভিত্তিসূত্র বাংলা ভাষা। ‘একুশ’-এর সূত্র ধরে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা এবং বাঙালি জাতিকে গৌরবান্বিত করার শ্রেষ্ঠ সন্তানের নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাংলা ভাষা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র সফলভাবে মোকাবিলা করা শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম সাফল্য।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলা যেমন শোষিত শ্রেণির ভাষা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শনও শোষিত শ্রেণির মুক্তির জন্য লড়াই-সংগ্রাম করা। সেই অর্থেও বঙ্গবন্ধু, বাংলা ভাষা ও বাঙালির আন্দোলন একই সূত্রে গাঁথা।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের আগেও যুগে যুগে বাংলা ভাষা নিয়ে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছে। তেরো শতকে তুর্কি, এর কিছুকাল পর পর্তুগিজ, ষোড়শ-সতেরো শতকে ফরাসি, আঠারো শতকে ইংরেজি ভাষীরা বাংলার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ও গোপনে ষড়যন্ত্র করেছে- শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছে। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা, বাঙালি জাতীয়তার চেতনাকে ধ্বংস করার নীল নকশার অংশ হিসেবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়কর্মী হিসেবে বাংলার জনগণের কাছে পরিচিতি লাভ করা তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দেন। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা এবং বাঙালি ছাত্রসমাজকে দেশপ্রেমের চেতনায় শানিত করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগ ও স্বাক্ষরে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নামে ১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার জন্য একটি লিফলেট প্রচার করা হয়।

এই লিফলেট সম্পর্কে তৎকালীন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, “I have the honor to report the particulars of the members of the Provisional Organizing Committee of East Pakistan Muslim Students League as follow. They were the signatories the leaflet which advocated Bengali to be the State Language for Pakistan.”

গোয়েন্দা সংস্থার এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, “…Sheikh Mujibur Rahman, who was one of the signatories of the leaflet which advocated Bengali to be the Students League of Pakistan.”

শেখ হাসিনা সম্পাদিত Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation BANGABANDHU SHEIKH MUJIBUR RAHMAN গ্রন্থ পাঠে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও সক্রিয় ভূমিকা ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়।

‘ভাষা আন্দোলন, সমকালীন রাজনীতি ও শেখ মুজিব’ নিবন্ধে শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘তরুণ জননেতা শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সূচনা ১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ডাকা ধর্মঘটের পক্ষে জনমত গঠন করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন জেলায় ছাত্র সমাবেশ করেন। ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলের এক সভায় ১১ মার্চের কর্মসূচিকে সফল করতে তিনি নেতাকর্মীদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে নির্দেশনা দেন। ১১ মার্চের আন্দোলনে শেখ মুজিব পুলিশি হামলার শিকার হয়ে গ্রেফতার হন।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমাদের প্রায় সত্তর-পঁচাত্তরজনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়।” কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমুদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, জনাব শামসুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেপ্তার হই এবং আবদুল ওয়াদুদ-সহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেপ্তার হয়।”

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানের সমাবেশে যখন ঘোষণা করেন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।’ তখন শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার নেতৃত্বে উপস্থিত ছাত্র-জনতা তার প্রতিবাদ করেন।

আজাদী দিবস (পাকিস্তান স্বাধীনতা দিবস, ১৪ আগস্ট ১৯৪৭) উপলক্ষে ১৯৪৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যে বিবৃতি দেন, সেটিও ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির অধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

কলকাতার ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় সেই বিবৃতিটি প্রকাশিত হয়েছিল। ‘Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation BANGABANDHU SHEIKH MUJIBUR RAHMAN’ গ্রন্থেও উল্লিখিত বিবৃতি রয়েছে।

‘তাঁকে যেমন দেখেছি’ গ্রন্থে আবুল ফজল লিখেছেন, “কালে কালে অধিকারের প্রশ্নে বাঙালি জেগে উঠলেও, সূর্যের তেজে চির-অম্লান স্বাধীনতার বীজ এই জাতির চেতনায় প্রথম উপ্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর; এবং সেটা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে, যার অন্যতম নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তখন এ দেশের ছাত্রসমাজকে তিনি সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করেছিলেন; প্রকৃতপক্ষে বাংলার ছাত্র আন্দোলনের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা।”

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব কারাগারে বন্দি ছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালের ৩০ আগস্ট থেকে ১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেশ কয়েকবার বন্দি মুজিবকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান নানাভাবে ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে নির্দেশনা দেন। ভাষা আন্দোলনে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থ পাঠেও ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দারা যে তাকে নিবিড়ভাবে চোখে রাখতেন সে বিষয়ে জানা যায়। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে।…আমি ওদের রাত একটার পর আসতে বললাম।…দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত।…বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে।’’

বায়ান্নপরবর্তী একুশের আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার নাম থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করলে বাংলা ও বাঙালির প্রতি আত্মনিবেদনে উন্মুখ ও অবিচল বঙ্গবন্ধু প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি বলেন, “…ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। ‘বাংলা’ শব্দটির একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য…।”

সেই সময় থেকেই বাঙালির রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনে ‘পূর্ব বাংলা’ নামটি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তুঙ্গ গতি পায়। সামরিক ও আইয়ুব শাসক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও তিনি থেমে থাকেননি। পাকিস্তানি শাসক ও শোষকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি নতুন সংগঠন করেন, সেই সংগঠনটির নামও দেয়া হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ।’

১৯৫৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদের অধিবেশেনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান খসড়া শাসনতন্ত্রের অন্তর্গত জাতীয় ভাষা-সংক্রান্ত প্রশ্নে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, পূর্ববঙ্গে আমরা সরকারি ভাষা বলতে রাষ্ট্রীয় ভাষা বুঝি না। কাজেই খসড়া শাসনতন্ত্রে রাষ্ট্রের ভাষা সম্পর্কে যেসব শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা কুমতলবে করা হয়েছে। পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ৫৬ ভাগ লোকই বাংলা ভাষায় কথা বলে- এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রশ্নে কোনো ধোঁকাবাজি করা যাবে না। পূর্ববঙ্গের জনগণের দাবি এই যে, বাংলাও রাষ্ট্রীয় ভাষা হোক।

১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আইন পরিষদের অধিবেশনে রাষ্ট্রভাষা ও আঞ্চলিক বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানেও বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। (তথ্যসূত্র: মহিউদ্দিন আহমেদ খান সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ১০০ ভাষণ’)

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন এদেশের নাম ‘বাংলাদেশ’। সে সভায় তিনি বলেন “একসময় এদেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। …একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোন কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। …জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।”

১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইত্তেফাক গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স-এর সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক ‘পূর্বাণী’র ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, জনগণের স্বার্থে এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য সাহিত্যিকদের প্রাণ খুলে আত্মনিয়োগ করার জন্যে আমি আবেদন জানাচ্ছি। আমি তাদের আশ্বাস দিচ্ছি, কবি এবং সাহিত্যিকবৃন্দের সৃষ্টিশীল বিকাশের জন্য যেকোনো অন্তরায় আমি এবং আমার দল প্রতিহত করবে। …রাজনৈতিক ক্ষমতা না পেলে সংস্কৃতিকে গড়ে তোলা যায় না। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল না বলেই বাংলা সংস্কৃতির বিকাশ হয়নি।

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, …‘স্বাধিকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে জাতীয় জীবনে ফেব্রুয়ারির গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলা একাডেমি যে সপ্তাহ পালন করছে সে সপ্তাহ বাংলাদেশের জীবনে এক কঠিন সপ্তাহ। ফেব্রুয়ারির এই দিনেই বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছেন ভাষা আন্দোলনের শহীদেরা, এই সপ্তাহেই কুর্মিটোলার বন্দিশিবিরে হত্যা করা হয়েছে সার্জেন্ট জহুরুল হককে, এই সপ্তাহেই শহীদ হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা, আর এই সপ্তাহেই কারফিউ নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে আত্মাহুতি দিয়েছে এ দেশের অসংখ্য মায়ের অসংখ্য নাম জানা সন্তান।…আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস-আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে।’

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধুকে কেউ ‘দাবায়ে’ রাখতে পারেননি। তিনিই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রপতি হিসেবে এক আদেশে তিনি বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা। তবুও অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, স্বাধীনতার তিন বছর পরেও অধিকাংশ অফিস-আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই, দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। চাকরি, পদোন্নতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিচারে বাংলা ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে বাংলা শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিলো চারদিকে। কিন্তু পঁচাত্তরের পর স্রোত বিপরীতমুখী হয়ে ওঠে- উগ্র হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীলতা। ‘বাংলাদেশ বেতার’, ‘চালনা বন্দর’, ‘পৌরসভা’, ‘রাষ্ট্রপতি’ প্রভৃতি ‘রেডিও বাংলাদেশ’, ‘পোর্ট অব চালনা’, ‘মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন’, ‘প্রেসিডেন্ট’ হয়ে উঠতে থাকে।

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ভাষায়, “বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় আবিষ্কারের কাজ, যা শিল্পী-কবি-মনীষীরা করে চলেছিলেন একটি স্তরে, সেই কাজটিকে তার যৌক্তিক, রাজনৈতিক পরিণতিতে পৌঁছে দিলেন বঙ্গবন্ধু।” বাংলা ভাষা যেমন বাঙালি জাতিসত্তার মতো অমর, তৎপর, অবিনশ্বর তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির মুক্তির গৌরবোজ্জ্বল দর্শন।

বাংলা ভাষায় প্রদত্ত তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর ঐতিহাসিক দলিলের স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১০ সাল থেকে বাঙালির ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে জাতিসংঘ সদস্যভুক্ত রাষ্ট্রে পালিত হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের প্রথম ভাষা বা মাতৃভাষা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষামাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে। পৃথিবীর বহুদেশে এ ভাষার সুদীপ্ত অনুশীলন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির প্রিয় জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা…’ পৃথিবীর মধুরতম সংগীতের একটির স্বীকৃতি পেয়েছে।

তাই, বলা যায়, যতবেশি বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ দৃঢ় হবে, তত বেশি সমৃদ্ধ হবে বাংলা-বাঙালি, বাংলাদেশের প্রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দায়িত্ব-কর্তব্য, ত্যাগ-মহিমার স্বীকৃতি।

লেখক মুহম্মদ মনিরুল হক : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | Source: Newsbangla24 Link

আরও পড়ুন