বঙ্গবন্ধু কেন শ্রেষ্ঠ বাঙালি

সম্পাদনা/লেখক: Zakir Hossain

বাংলাদেশের তিনি জাতির পিতা এবং বঙ্গদেশের (বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার) সমগ্র বাঙালির মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে স্বীকৃত হয়েছেন। কারণ বাঙালির জন্য একটি স্বাধীন দেশের তিনিই প্রথম রূপকার। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মধ্যযুগে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ স্বাধীন সুলতান হিসেবে বাংলাদেশের সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। কিন্তু ইলিয়াস শাহ বাঙালি ছিলেন না। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম বাঙালি যিনি স্বাধীন বাংলার প্রথম নৃপতি।

বাঙালিদের স্বাধীন ভূমি এনে দেওয়ার প্রয়াস ছিল অনেক বাঙালি নেতারই এবং বাঙালিকে ভালোবেসেছিলেন অনেক জননেতাই। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষ বসু, এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের অবদান বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয়। বাঙালিরাও তাদের আর নাম ধরে ডাকে না। বলে থাকে ‘দেশবন্ধু’, ‘নেতাজী’, ‘শেরে বাংলা’ নামে। তবে ‘বঙ্গবন্ধু’র সব খেতাবকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে স্থান লাভ করেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এ ভাষণের অন্য নাম ‘বজ্রকণ্ঠ’। এ কণ্ঠ কাঁপিয়ে দিয়েছিল সমগ্র দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষকেও। তাই বিশ্বের বড়ো বড় জননেতাকেও ছাড়িয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু।

বিবিসির বাংলা সার্ভিসের জরিপে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই জরিপের ফলে ব্যাপকভাবে আন্দোলিত হয়েছেন। শিক্ষিত মননশীল সমাজ ভালোভাবেই জানতেন যে, বঙ্গবন্ধুর স্থান বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাসে নির্ধারিত হয়ে আছে। কেউ ইচ্ছে করলেই তাঁকে ইতিহাস থেকে নির্বাসিত করতে পারবে না। মহাত্মা গান্ধীকে বাদ দিয়ে যেমন ভারতের ইতিহাস লেখা যায় না, মাও সেতুংকে বাদ দিয়ে চীনের, হো চি মিনকে বাদ দিয়ে ভিয়েতনামের ইতিহাস লেখা যায় না, জর্জ ওয়াশিংটনকে বাদ দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস লেখা যায় না, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যায় না।

তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীন রাষ্ট্র এনে দিয়েছেন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালির আবাসভূমি বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বিবিসির জরিপটি বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা’। এই বিষয়টি সর্বোচ্চ বিবেচনায় রেখে জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ অভিমত প্রদান করেছেন। বাঙালি জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করার স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত কাব্য, মহাকাব্য ও অন্যান্য সাহিত্য কিংবা প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও গবেষণা হয়েছে, দুনিয়ার আর কোনো জননেতা সম্পর্কে হয়তো এত রচনা এখনো রচিত হয় নি। তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তিনি তাই অনন্য, অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যাও কম নয়। এগুলোর মধ্যে বাংলা একাডেমী কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর জীবনী গ্রন্থ (দুই খণ্ডে) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি (২০০৮), রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি (১৯৮২), ইতিহাসের আলোকে বাঙালি জাতীয়তার বিকাশ ও বঙ্গবন্ধু (১৯৯২), ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু (১৯৯৪), মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব (১৯৯৫), শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ (১৯৯৮), বাঙালি বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু (২০০০), বাংলাদেশের সমাজবিপ্লবে বঙ্গবন্ধুর দর্শন (২০০০), ইতিহাসের আলোকে বাঙালি জাতীয়তার বিকাশ ও বঙ্গবন্ধু (প্রথম সংস্করণ-১৯৯২, দ্বিতীয় সংস্করণ-২০০০), বাঙালির কণ্ঠ (২০০১), সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি (২০০৪), একবিংশ শতাব্দীতে মুজিবের প্রাসঙ্গিকতা (২০০৭), সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি (২০১০), বাঙালির ঐতিহ্য ও ভবিষ্যৎ (২০১০), আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ (২০১০)।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বহু পণ্ডিত ব্যক্তির এত লেখালেখির মধ্যে সম্প্রতি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর `অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটিতে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে, বিবিসি জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হওয়ায় যথার্থতাই প্রমাণ করে। আজ থেকে ১৮ বছর আগে ১৪০০ সাল উদযাপন পরিষদের ‘বাঙালির বাংলাদেশ’ নামক সংকলন গ্রন্থ আমরা উৎসর্গ করেছিলাম সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বিবিসির জরিপ এ সত্যই প্রমাণ করেছে। বিবিসির জরিপ প্রকাশের পর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে দেশের ভেতরে এবং বাইরে অবস্থানরত সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, কবি, সাংবাদিক বিবিসির জরিপের ফল স্বাগত জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন লেখনীর মাধ্যমে।

সম্প্রতি আমার ও ড. মোহাম্মদ হান্নানের প্রকাশিত ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ গ্রন্থটি প্রকাশনা জগতে স্থান করে নেবে এই জন্য যে, এই সংকলন ও সম্পাদনায় খানিকটা ব্যতিক্রম আছে। প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধুর বিশিষ্টতা, সুশীল সমাজের মূল্যায়ন, তৃতীয় অধ্যায়ে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মূল্যায়ন, চতুর্থ অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধুর শৈশব-কৈশোর ভিত্তি করে নানা রকম রচনা, পঞ্চম অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড-পূর্বাপর ঘটনাবলী, ষষ্ঠ অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা-পরবর্তী নানা প্রতিবাদের দালিলিক বিবরণ, সপ্তম অধ্যায়ে বিভিন্ন মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি-প্রশস্তি এবং অষ্টম অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধুর বিখ্যাত ভাষণগুলো মুদ্রিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর উপর হাজারো গ্রন্থের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালি’ গ্রন্থ দুটি এজন্য ব্যতিক্রম হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে যখন বঙ্গবন্ধুর ওপর আরও গবেষণা হবে তখন বহু গ্রন্থের মধ্যে এ গ্রন্থ দুটি নানামুখী মূল্যায়ন ও তথ্যের আকর হিসেবে দেখা দেবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

মোনায়েম সরকার ।

সূত্র: বিডিনিউজ ২৪- লিঙ্ক । ১৭ আগস্ট, ২০১২

আরও পড়ুন