বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কিছু স্মৃতি

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

পৃথিবীকে আলোকিত করার জন্য প্রাকৃতিক নিয়মে পুবাকাশে সূর্য উঠেছিল ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। সঙ্গে বাঙালি জাতির জন্য সোনালি আভা নিয়ে আরেকটি সূর্য উঠেছিল, সেই সূর্যের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে সূর্যের সোনালি রোদ এসে বাঙালি জাতিকে উপহার দিয়েছিল একটি জাতিরাষ্ট্র, লাল সবুজের একটি পতাকা ও একটি জাতীয় সংগীত। সঙ্গে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ঠাঁই করে দিয়েছিল, বাঙালিকে এনে দিয়েছিল আত্মপরিচয়ের নতুন ঠিকানা বাংলাদেশ।

স্বাধীন বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে সপরিবার হত্যার মধ্য দিয়ে  দুর্বৃত্তরা সেদিন চেয়েছিল তাঁর নাম বাংলার মাটি থেকে মুছে ফেলতে! কিন্তু যে নামটি বাঙালির হৃদয়ে গাঁথা, যে নামটি শুনে ১৯৭১ সালে এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সে নামটি এত সহজে বাঙালির হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যে অসম্ভব, নরপশুরা সেদিন তা বুঝতে পারেনি।

যে মানুষটি একদিন আমার মতো লাখো ছাত্র-জনতার মনে চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন, দেশপ্রেমের দীক্ষা দিয়েছিলেন, যাঁর ভাষণ শুনে আমরা রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলাম, রাজনীতিকে একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান মনে করেছিলাম, স্বাধীন দেশেই মাত্র কয়েক বছরের  মাথায় তাঁকে  আমাদের হারাতে হয়েছে!

বাঙালি জাতির প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে টুকরো টুকরো অনেক স্মৃতি আজও আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। আমৃত্যু আমি এসব স্মৃতি ধারণ করে যাব। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল ঢাকা কলেজে আমার বন্ধু হওয়ার পর থেকে আমি প্রায় সময় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে যেতাম। কামালের বন্ধু আর ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এ দুই পরিচয়ের কারণে বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিব আমাকে স্নেহের চোখে দেখতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ আর অদৃশ্য এক মায়ার বন্ধন আমাকে কারণে-অকারণে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে টেনে নিত। চোখ বুজে এখনো আমি অনুভব করি বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব, আমার পিঠে বোলানো তাঁর স্নেহের হাত। আমার সেই সুখস্মৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, শ্রেষ্ঠ অর্জন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি  চট্টগ্রামের  লালদীঘি ময়দানের এক জনসভায়। ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণার ওপর এটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম জনসভা। আমি তখন চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র, একই সঙ্গে স্কুল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। লালদীঘি ময়দান ছিল মুসলিম হাই স্কুলের খেলার মাঠ। তাই স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো লালদীঘি ময়দানে কর্মসূচি পালন করত। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সেদিন আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম। তাঁর ভাষণ আমাকে বিমোহিত করল, রক্তে আগুনের ঢেউ খেলে গেল। বাঙালি জাতিসত্তার ভবিষ্যৎ নেতাকে এত কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করলাম। মনে মনে দীক্ষা নিলাম, ছয় দফার সক্রিয় কর্মী হিসেবে শুরু হলো আমার নতুন যাত্রা।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা একটি  উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। মামলার প্রধান আসামি বিকাশমান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা শেখ মুজিব। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে বিশেষ সামরিক আদালতে তখন মামলার ট্রায়াল চলছিল। আমি তখন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। প্রচন্ড ইচ্ছা হয়েছিল প্রিয় নেতাকে একবার দেখতে যাওয়ার। কিন্তু এতে ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি দেখতে যাওয়ার প্রক্রিয়াটাও ছিল বেশ  জটিল। চিন্তায় থাকলাম কিছু একটা উপায় বের করার, কয়েকদিনের মধ্যে উপায় বের হয়েও গেল। আগরতলা মামলার অন্যতম কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান (তিনি ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যশোরে তাঁকে আটক করে এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে  হত্যা করে।) হলেন ঢাকা কলেজে আমার সহপাঠী মাহমুদুর রহমানের বাবা। মশিউর চাচার কাছে শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম, আমার কথা শুনে তিনি আশ্চর্য হলেন! ঐতিহাসিক সেই দিনটি ছিল ৮ আগস্ট, ১৯৬৮। আমার মধ্যে সে কি উত্তেজনা, বাঙালির মুক্তিকামী জনতার প্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে দেখতে যাওয়ার অধীর আগ্রহের অপেক্ষা যেন শেষ হতে চায় না! অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটালাম, পরদিন সকাল ৭টার মধ্যে আমাকে মশিউর চাচা তাঁর ধানমন্ডির বাসায় উপস্থিত থাকতে বললেন। যথারীতি পরদিন সকালে আমি মশিউর চাচার ধানমন্ডির বাসায় উপস্থিত হলাম। চাচা  জিজ্ঞাসা করলেন ‘তুমি ক্যান্টনমেন্টে যাবে কীভাবে?’ আমি বললাম ‘রিকশা করে যাব।’ তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘রিকশা করে তুমি বেশি দূর যেতে পারবে না।’ শেষে বললেন, ‘চল আমার সঙ্গে।’ তিনি গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে গেলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে বিশেষ সামরিক আদালতে। এরপর তিনি এলেন, কাছ থেকে দেখলাম ভবিষ্যৎ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। যাঁকে দেখার জন্য আমার এত ব্যাকুলতা, তিনিই মশিউর চাচার কাছে আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। মশিউর চাচা বললেন, রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, শেখ কামালের সহপাঠী। বঙ্গবন্ধু তাঁকে বললেন, ‘এত ঝুঁকির মধ্যে তার এখানে আসা ঠিক হয়নি।’ আমি সৌভাগ্যবান অ্যাডভোকেট মশিউর চাচার বদান্যতায় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সামরিক আদালতের সেদিনের পাসটি আমার কাছে কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো সংরক্ষিত আছে।

 

রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ১৬ আগস্ট ২০২০ লিংক

আরও পড়ুন