স্মৃতিতে রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

আমরা তখন থাকি পুরান ঢাকার ১৫০ নম্বর চক মোগলটুলীতে (এ বাড়িতেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের গোড়াপত্তন হয়)। তিনতলা বাড়ির তৃতীয় তলায় আমাদের বসবাস। দ্বিতীয় তলায় ছিল আমার আব্বার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কার্যালয়, আর নিচতলাটা ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা জায়গা। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, প্রতিদিনের মতো খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। প্রাইমারি ক্লাসের ছাত্র ছিলাম। আম্মা এসে বললেন, আজকে স্কুলে যেতে হবে না। দেশের অবস্থা ভালো না, বাইরে গ-গোল হচ্ছে। আব্বাকে দেখলাম একটার পর একটা সিগারেট টেনে যাচ্ছেন আর টেলিফোনে বিভিন্ন জায়গায় কথা বলার চেষ্টা করছেন। গণভবন, বঙ্গবন্ধুর বাসা, তাজউদ্দীন চাচার বাসাসহ পরিচিত কয়েকজনের বাসায় ফোন করেছেন। কিন্তু কারও কারও বাসার লাইন পাওয়া যাচ্ছিল না আবার কারও বাসায় কেউ টেলিফোন রিসিভ করছিলেন না। আব্বার টেনশন আরও বেড়ে গেল। কোথায় ফোন করলে সঠিক খবরটা পাওয়া যাবে এই ভেবে আরও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। শেষে আমাদের এক খালার বাসায় ফোন করলেন। শোভা খালা, উনি থাকতেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর পাশের বাসায়। খালার বাসার দোতলায় সে সময় বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার বসবাস। তারা খুব সম্ভবত আগস্টের প্রথম দিকে পশ্চিম জার্মানি চলে যান, শেখ রেহানাসহ। খালাকে ফোনে পাওয়া গেল। খালা বললেন, ‘শওকত ভাই আমরা খুব বিপদে আছি। ভোর থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসা এবং আমাদের বাসা লক্ষ্য করে প্রচুর গুলিবর্ষণ এবং শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে।’ আব্বা বললেন, ‘আপনারা সবাই আমার বাসায় চলে আসেন, না হয় আমি এসে আপনাদের নিয়ে আসি।’ খালা বললেন, ‘এখন বাসা থেকে মুভ করার কোনো উপায় নেই ভাই। কালো পোশাক পরা সেনাবাহিনীর লোকজন চতুর্দিক ঘেরাও করে রেখেছে।’ আব্বা খালাকে জিজ্ঞেস করলেন, মুজিবের বাসার কী অবস্থা? খালা জানালেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত কিছুই জানি না শওকত ভাই।’ একসময় টেলিফোন লাইনটা ডিসকানেক্ট হয়ে যায়।

তার পরের ঘটনা খুবই হৃদয়বিদারক। আব্বা এক সময় জানতে পারলেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু, সুখ-দুঃখের সাথী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবারের সব সদস্যসহ নিহত হয়েছেন। এই দুঃসংবাদ শোনার মতো মানসিক শক্তি তার ছিল না। ঘটনার আকস্মিকায় তিনি হতবিহ্বল ও বাকরুদ্ধ হয়ে যান। একবার শুধু বললেন, মুজিবরে মাইরা ফেলছে, মুজিব নাই! তারপর থেকে আস্তে আস্তে আব্বার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। আম্মা বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন পরিচিত ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। কিন্তু শহরে সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকায় কেউ বাসা থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছিলেন না। বিকালের দিকে একজন ডাক্তার বাসায় এসে আব্বাকে ভালোভাবে চেকআপ করে জানালেন, উনি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হসপিটালে ট্রান্সফার করতে হবে। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। শত চেষ্টা করেও সেদিন একটা অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। কোনো উপায়ন্তর না দেখে ডাক্তার একটা ইনজেকশন দিলেন আব্বাকে এবং কয়েকটা ওষুধ দিয়ে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলে চলে গেলেন। পরিবারের সবাই সেদিন নির্ঘুম রাত পার করলেন। পরদিন আব্বাকে হসপিটালে ভর্তি করা হলো। আব্বার সুস্থতার জন্য চিকিৎসকরা সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলেন। কিন্তু দীর্ঘসময় অচেতন থাকার পর চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে আমাদের পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ১৮ আগন্ট ১৯৭৫ সালে আব্বা ইন্তেকাল করেন।

বাঙালির ইতিহাসের আঁতুড়ঘর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর। ১৫০ নম্বর মোগলটুলীর শওকত আলীর বাড়ি। এই দুটি বাড়ির ভেতরের ইতিহাস সংগ্রামে ভালোবাসায় সিক্ত। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের হিংস্র কুটিল স্রোতধারা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সব কিছু। এ দুই পরিবারের মধ্যে সুদীর্ঘ যোগাযোগের কারণে গড়ে ওঠা নিবিড় সম্পর্ক মুহূর্তের বিয়োগান্তক ঘটনায় ছিন্নলতার মত ভূলুণ্ঠিত হয়ে যায়। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত সহস্রাব্দের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনকে বিস্মৃতির অনন্ত তমসায় নিমজ্জিত করতে তৎপর হয়ে ওঠে ’৭৫-পরবর্তী প্রশাসন। তাদের সে বৈরী আচরণ থেকে রেহাই পায়নি বঙ্গবন্ধুর মহাপ্রয়াণের সহযাত্রী, তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সুহৃদ শওকত আলীর অসহায় পরিবারও।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আমার বাবা ভাষাসৈনিক শওকত আলী ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহচর। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে বন্ধু শওকত আলী সম্বন্ধে অনেক জায়গায় স্মৃতিচারণ করে গেছেন। তারই একটি বর্ণনায় তিনি লিখেছেন, ‘শওকত আমাকে নিয়ে কী যে করবে ভেবেই পায় না। তার একটা আলাদা রুম ছিল। আমাকে তার রুমেই জায়গা দিল। আমি তাকে শওকত ভাই বলতাম। সে আমাকে মুজিব ভাই বলত।’ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে সদ্য কলকাতা থেকে দেশে ফেরা বঙ্গবন্ধু এভাবেই শওকত আলীর ১৫০ নম্বর মোগলটুলীর লীগ অফিসের বাসায় তার অবস্থান গ্রহণের প্রাঞ্জল বর্ণনা দিয়ে গেছেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগকে কেন্দ্র করে কলকাতায় পুলিশি নজরদারি আর গ্রেপ্তার বেড়ে যাওয়ায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুমতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু পূর্ববঙ্গে ফিরে এলেন। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ গ্রামের বাড়িতে পিতা, মাতা ও স্ত্রীর সান্নিধ্যে ক’দিন কাটিয়ে রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় হতে প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় উপস্থিত হলেন। সে সময় ঢাকা তার কাছে অনেকটাই অচেনা শহর। উঠলেন তার বন্ধু ১৫০ নম্বর মোগলটুলির লীগ অফিসে শওকত আলীর বাসায়। দুজনই ২০-এর কোঠা পার না হওয়া প্রতিবাদী রাজনীতির উন্মাতাল কর্মী। ১৯৪৮ সালের দেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার রক্তাক্ত পথপরিক্রমায় শওকত আলী ছিলেন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ও নেতৃত্ব প্রদানকারী। ভাষা আন্দোলন চলাকালীন তিনি সবচেয়ে বেশি পুলিশি নির্যাতনের শিকার হন। বর্তমান সরকারের আমলেই মহান ভাষা আন্দোলনে কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অবদানের জন্য শওকত আলীকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ঢাকা সিটি করপোরেশনও জাতির গর্বিত সন্তান শওকত আলীর নামে ধানমন্ডির ৪/এ, সড়কটির নামকরণ করে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন শুরু হয়েছে গত ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি বাঙালি এই মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতিই নন। তার আমৃত্যু সংগ্রাম, ত্যাগ তিতিক্ষা ও অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান তাকে তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগণের মুক্তির দিশারি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারগুলোর ত্যাগ-তিতিক্ষার যথার্থ স্বীকৃতি প্রদানে বলিষ্ঠ জননন্দিত ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সোপান রচিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে। আমার আন্তরিক প্রত্যাশা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে, জীবিত ও মৃত প্রকৃত ভাষাসৈনিক ও তাদের এখনও জীবিত প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারদের মুক্তিযোদ্ধাদের মতো সব সুযোগ-সুবিধা প্রদানের বিষয়টি সদয় বিবেচনায় নেবেন। সবশেষে মরমি গান দিয়ে এই লেখাটি শেষ করতে চাই। ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত/বঙ্গবন্ধু মরে নাই/রাজপথে যদি আবার মিছিল হতো/বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই, মুক্তি চাই/তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা/আর আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা।’ আমি ফিরে পেতাম আমার মুজিব চাচাকে, যাকে খুঁজতে আমি এখনও ৩২ নম্বরের আকাশে-বাতাসে কান পাতি! যা ছড়িয়ে যায় ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলে।

 

মহিউদ্দিন আল আমান শাহেদ
১৯ আগস্ট ২০২০ লিংক

আরও পড়ুন