ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

সব মানুষ ক্ষণজন্মা হয় না। ‘কর্ম’ মানুষকে ক্ষণজন্মা করে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা ইতিহাস-ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী ক্ষণজন্মা শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন আজ। বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের প্রাণশক্তি শেখ হাসিনার জন্মদিনের শুভক্ষণে তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনায় নিরন্তর প্রার্থনা।
১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ক্রমাগত উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটতে শুরু করে। সে হিসেবে সমৃদ্ধির এই যাত্রা খুব বেশিদিনের নয়। এ সময়ে বাংলাদেশের সাফল্য সারা বিশ্বে নজিরবিহীন। মাত্র ২৪-২৫ বছরে বঙ্গবন্ধুর ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। গেল বছর জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশনে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে আমেরিকা গিয়েছিলাম। জাতিসংঘের ওই অধিবেশনে সারা বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা যোগ দিয়েছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় শেখ হাসিনার অসামান্য অবদান ও কৃতিত্বের কারণে জাতিসংঘ অধিবেশনে তার হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল দুটি পুরস্কার। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননায় ভ‚ষিত করে গেøাবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনস এন্ড ইমিউনাইজেশন। এই পুরস্কার তার হাতে তুলে দেন বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতিমান এনগোজি ওকোনজো-আইয়েলা। তিনি শেখ হাসিনাকে যেসব বিশেষণে প্রশংসা করেছিলেন তা সত্যিই অবিস্মরণীয়। ভ্যাকসিন হিরো ছাড়াও তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফর ইয়ুথ’ সম্মাননায় ভূষিত করে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ।
এ দুটি পুরস্কার একসঙ্গে পাওয়া বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের যে মর্যাদা বেড়েছে তার প্রমাণ মিলে বহুমাত্রিকভাবে। আমেরিকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশি একাধিক লোককে দেখেছি স্বচ্ছন্দচিত্তে মার্কিনিদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। তাদের আচার-আচরণে বাংলাদেশি সহকর্মীদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টিও প্রত্যক্ষ করেছি। অধিবেশনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি বিশ্ব নেতারা যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, গুরুত্ব দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেছেন, খানিকটা দূর থেকে নিজের চোখে সব কিছু দেখেছিলাম। বিশ্ব নেতাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় শেখ হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে আমার কাছে নরেন্দ্র মোদি বা ইমরান খানের চেয়েও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী মনে হয়েছিল। অধিবেশন চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরতিহীন প্রোগ্রাম করেছেন। সফরসঙ্গী সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছুটতে ছুটতে টায়ার্ড হয়ে গেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী একের পর এক কাজ করে গেছেন। তার এই বিরতিহীন ছুটে চলায় বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে সুপ্রতিষ্ঠিত।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৪৯ বছর আগে যে দেশের মানুষ এক বেলা খাবারের জন্য অমানুষিক শ্রম বিক্রি করত সে দেশের মানুষ দুনিয়ার যে কয়টি দেশের মানুষ স্বল্প বা সামান্য মূল্যে খাদ্য পায়, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশে নিজেদের উপার্জনে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা একটি বিস্ময়কর বিষয়। শুধু খাদ্য নয়, আরো অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমাগত সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি এখন মোটামুটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলছে। চলতি অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। যদি তাই হয়, তবে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশ চীন, ভারত ও ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে যাবে। এর মূল কারণ হচ্ছে, দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এখন প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি আছে। প্রতি মাসে ন্যূনতম ১০০ মিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স যুক্ত হচ্ছে। করোনাকালীন সারা দুনিয়ার ধনী দেশগুলো যেখানে তাদের অর্থনীতিকে সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অবিশ্বাস্যভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী বছর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
কিন্তু এত কিছুর পরও কিছু সমস্যা আছে, যা বিতর্কের জন্ম দেয়। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্র ও দেশপ্রেমিক পুঁজির সংকট। বাংলাদেশে সব আছে, শুধু এ দুটির সংকট রয়েছে। একটি দেশ ও জাতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক আমলাতন্ত্র ও দেশপ্রেমিক পুঁজি খুবই জরুরি। এ দুটি থাকলে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে অনাচার কম হয়। সুতরাং সে বিবেচনা থেকে আজ ও আগামীর বাংলাদেশের জন্য সাংবাদিকদের চারটি বিষয় মাথায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ দায়িত্ব পালন করতে হবে :
সর্ব প্রথম, বঙ্গবন্ধু-বাংলাদেশ। এই ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই। কারণ বাংলাদেশটা আকাশ থেকে পড়েনি। এটি সৃষ্টি হয়েছে। এই সৃষ্টির পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। একজন মানুষ সারাজীবন এ দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনপণ সংগ্রাম করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সুতরাং এ নিয়ে কোনো ভিন্ন যুক্তি থাকতে পারে না। এখানে একনিষ্ঠতাই বস্তুনিষ্ঠতা।
দ্বিতীয় হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’। ভারত-পাকিস্তানের মতো আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ লড়াই করে দেশটা স্বাধীন করেছে।
তৃতীয় হচ্ছে ‘অসাম্প্রদায়িক সমাজ-রাষ্ট্র’। বাংলাদেশের হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, উপজাতি সবাই একেক জাতের, একেক ধর্মের। কিন্তু তারা সবাই বাঙালি। হাজার বছর ধরে গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলের এই ভূখণ্ডে সামাজিক সম্প্রতি বজায় রেখে বাঙালির জীবন-সংগ্রামের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব বাঙালি মিলে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। সুতরাং বাঙালির জাতিগত এই ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে কোনো আপস বা ভিন্ন কোনো যুক্তিক নেই। এ প্রশ্নে বস্তুনিষ্ঠতা হচ্ছে, একনিষ্ঠতা।
সর্বশেষ হচ্ছে, ‘উন্নয়ন’। মাত্র ৪৯ বছরের বাংলাদেশ প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশকে পেছনে ফেলে অর্থনৈতিক সূচকসহ বিভিন্ন সূচকে বহুদূর এগিয়ে গেছে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে খ্যাত বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের একটি সক্ষম রাষ্ট্র। উন্নত দেশের মহাসড়কের যাত্রী। আমাদের বর্তমান সন্তান-সন্ততিদের ভবিষ্যৎ সুখী-সমৃদ্ধ জীবনের জন্য উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। সুতরাং মানবাধিকারের অজুহাতে এর বিরুদ্ধে কোনো রাজনীতিক যুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচারের বাহানা গ্রহণযোগ্য নয়। এখানেও বস্তুনিষ্ঠতা হচ্ছে উন্নয়নের পক্ষে একনিষ্ঠতা।
এই চারটি আদর্শে যারা বিশ্বাস করে না তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। রাষ্ট্রদ্রোহীর কোনো মানবাধিকার নেই, থাকতে পারে না। গান্ধীজিকে ভারত সরকার জাতির পিতার মর্যাদা দেয়। গান্ধীজি অসাম্প্রদায়িক, অহিংস রাজনীতির পুরোধা। কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু আজকের ভারত শাসন করছে কট্টর হিন্দু মৌলবাদী রাজনৈতিক দল বিজেপি। কিন্তু তারা গান্ধীজিকে ফেলে দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সময় পেলেই রাজঘাটে গিয়ে প্রার্থনা করেন। অপরদিকে পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইসলামিক রিপাবলিক পাকিস্তানের জাতির পিতা। তার দল মুসলিম লীগ। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখন আলেমুল গায়েব হয়ে গেছে। জিন্নার চিন্তা-চেতনাবিরোধী জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি বহু দিন পাকিস্তান শাসন করেছে। জিন্নার মুসলিম লীগ ভেঙে টুকরো টুকরো। পাকিস্তানে এখন অনেক নতুন দলের জন্ম হয়েছে। কিন্তু তারাও জিন্নাহকে ফেলে দেয়নি, অমর্যাদা করে না। পৃথিবীতে এ রকম অসংখ্য নজির রয়েছে। সুতরাং কিছু লোকের প্রতিহিংসার কারণে জাতির গৌরবের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে মøান হতে দেয়া যাবে না। জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ঊর্ধ্বে রেখে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সুদূরের যাত্রী। ছোট্ট এই বাংলাদেশের পাশে এখন পৃথিবীর বড় সব শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো থাকতে চায়। সবার আগ্রহের কারণ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও দেশাত্মবোধ বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রাণশক্তি। তাই আজ তার ৭৪তম জন্মদিনের শুভক্ষণে আগামীর বাংলাদেশের জন্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার ক্ষণজন্মা শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনায় নিরন্তর প্রার্থনা।

 

মোল্লা জালাল ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ লিংক

আরও পড়ুন