আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

টানা ছয় মাস ধরে কোভিড-১৯ বা করোনার অদৃশ্য ছোবল। দিনে দিনে প্রাণহানি। শত শত। কোভিডের কারণে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজের সøথগতি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বোঝা, মিডিয়ার নামে ইউটিউব-অনলাইনের নোংরামি বাড়াবাড়ি, এর মধ্যেও যে মানুষ এতটুকু হতাশ নন বরং স্বাধীনতা স্তম্ভ, জাতীয় স্মৃতিসৌধ কিংবা স্ট্যাচু অফ লিবার্টির মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন, সম্মুখে এগিয়ে চলেছেন বিরামহীন আপন আদর্শে আপন লক্ষ্যে, তিনি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের কাছে সফল রাষ্ট্রনেতা শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার কালে বিদেশে থাকায় বেঁচে যাওয়া দুই কন্যার জ্যেষ্ঠ। আধুনিক উন্নয়নশীল ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার। পিতা স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন কন্যা তামাম ঝড়-ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছেন। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর তার ৭৪তম জন্মদিন। ৭৩ বছর পার করে ৭৪-এ পা রাখছেন। প্রিয় নেত্রী আপনি আমাদের অভিনন্দন গ্রহণ করুন। প্রার্থনা করি আপনি সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন। স্বজন হারানোর বুক ভরা বেদনা নিয়েও আপনি যেভাবে জাতির সেবা করে চলেছেন তা আজ কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী আপনি সম্মানীয় স্টেটসম্যান। আমরা বাংলাদেশের নাগরিকরাও আপনার গর্বে গর্বিত। আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আপনার জন্মদিন শুভ হোক, বারবার বহুবার আসুক।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহাকালের ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো জন্মদিন উদযাপন করেননি। স্বাধীনতার পর ’৭২-এর ১৭ মার্চ জন্মদিন উদযাপনের কথা বলা হলে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যে দেশে অধিকাংশ মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে কাটায় সে দেশে শেখ মুজিবুর রহমান জন্মদিনের উৎসব করতে পারে না, করবে না। পিতার মতোই কন্যা শেখ হাসিনাও কোনোদিন ঘটা করে জন্মদিন উদযাপন করেননি। জন্মদিন উদযাপনের প্রশ্ন এলে মনে পড়ে বাবা-মা, ভাই, ভ্রাতৃবধূ, ছোট ভাই শেখ রাসেলের কথা, মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তারপরও শত দুঃখের মাঝেও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন থেকে এতটুকু সরে দাঁড়াননি। বরং অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন আমার গরিব-দুঃখী মানুষ অর্থাৎ গরিব-দুঃখী মানুষকে ‘আমার’ বলার মতো বড় মন কেবল তাঁরই ছিল। আর কারো নয়। প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাও গরিব-দুঃখীবান্ধব, এককথায় জনবান্ধব। এবার করোনাকালে যখন মানুষ কাজ, ব্যবসা হারিয়ে অর্থকষ্টে পড়েন তখন শেখ হাসিনা প্রতিটি দরিদ্র অভাবী মানুষের ঘরে চাল, ডাল, তেল, লবণ, সাবান পৌঁছে দিয়েছেন। এমনকি সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে অর্থ অনুদান দিয়েছেন। দল-প্রশাসন একসঙ্গে কাজ করেছে। এমনকি আপৎকালে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কৃষকের ক্ষেতে ধান কেটে ঘরে তুলে দিয়েছে, যা দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এখানেই শেখ হাসিনা সাধারণের মাঝে অসাধারণ।
শেখ হাসিনা ভারত বিভাগের পর ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছে গ্রামের সহপাঠী (তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত) বন্ধুদের সঙ্গে হেসে-খেলে। বাবা রাজনৈতিক কারণে প্রায়ই জেলে থাকতেন। এলাকাটি ছিল পশ্চাৎপদ। গ্রামবাংলা বলতে যা বোঝায়। বর্ষায় খাল-বিল, নদী-নালা এমনকি ফসলের জমি পানিতে ডুবে যেত। তখন স্কুলে যাওয়া হতো না। শুষ্ক মৌসুমেও রাস্তা ছিল না, ধানের জমির আল দিয়ে বেণি উড়িয়ে আসা-যাওয়া করতেন। এভাবে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তারপর একদিন পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে গ্রামের সেই মধুর স্মৃতি ও বন্ধুদের চোখের জল পেছনে ফেলে মায়ের সঙ্গে ঢাকা চলে আসেন। কিন্তু ঢাকায় এসেও সংকটে পড়েন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি মিলিটারি রেজিমের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের রাজনীতি করতেন, যে কারণে অনেকেই বাসা ভাড়া দিতে চাইত না। আজ এই বাড়ি তো কাল অন্য বাড়ি এভাবে কয়েক বছর কাটিয়ে ১৯৬১ সালে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তখন দেড় তলার বাড়িটি নির্মাণ করতে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেয়া হয়েছিল। যথারীতি ইনস্টলমেন্ট দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পুরো পরিবারকে হত্যা করে বাড়িটি জিয়ার মিলিটারি জান্তা সিল করে রাখে। তখন দীর্ঘদিন আর ইনস্টলমেন্ট দেয়া হয়নি, কে দেবেন? শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তো বিদেশে এবং তারা জানতেনও না। আশির দশকের শেষার্ধে বাড়িটি ঋণখেলাপি হওয়ায় নিলামে বিক্রির জন্য নোটিস দেয়া হয়। হইচই পড়ে যায়। এই অসভ্য দেশেই এটা সম্ভব। তখনকার সরকারের পক্ষ থেকে একজন সচিব নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে ক্ষমা চেয়ে নেন এবং বাড়ির সব কাগজপত্র ফেরত দেন। ততদিনে অবশ্য ঋণের মূল টাকা শোধ হয়ে গিয়েছিল। সেই ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবন এবং জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ার পৈতৃক বাড়ি দুটি দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বাংলার জনগণকে দান করে দিয়েছেন। এখানেই বঙ্গবন্ধুর কন্যাদ্বয় একেবারেই আলাদা।
১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত অণুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ আলী মিয়ার কাছে জার্মানিতে ছিলেন বলে বেঁচে যান। সেই দুর্দিনে কিছু মানুষ চেনা অচেনা হয়ে যায়। তার একজন রাষ্ট্রদূত সামাউল হক। তবে হুমায়ন রশীদ চৌধুরী তাদের বাসায় নিয়ে যান। তারপর নিরাপত্তার কারণে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের সুহৃদ শ্রীমতি ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীর আমন্ত্রণে দিল্লিতে তার আশ্রয় যান। ১৯৮১ সালের ফেব্রæয়ারিতে দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে সব প্রতিক‚লতার জাল ছিন্ন করে দেশে ফিরে আসেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের রাজনীতির হাল ধরেন। গত ৪০ বছরে ৪ বারে ১৭ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় এবং বাকি সময়টা রাজপথে এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলের রাজনীতি করেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে শেখ হাসিনা দরিদ্র বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের কাতারে তুলে যে অসাধ্য সাধন করেছেন তা দেশে-বিদেশে বিস্ময়। দু-চারটি উদাহরণ হলো আজ দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, মানুষের মাথাপিছু আয় ২ হাজার মার্কিন ডলারের ওপর, মুদ্রাস্ফীতি ৬% নিচে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সারাদেশ বিদ্যুতায়িত, মানুষের গড় বয়স ৭৩ বছর, বাস্তবায়নের পথে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকার মেট্রোরেল এবং সর্বশেষ উত্তরবঙ্গের বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহের লক্ষ্যে মেগা প্রজেক্ট তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এভাবে জনগণের জীবন-জীবিকার মান উন্নয়নের নিশ্চয়তা এনশিউর করে ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সাল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের আয়োজন করেন। কিন্তু করোনা আসায় সব কর্মসূচির গতি স্লথ হয়।
কিন্তু ১৫ আগস্টের পর তাদের দুই বোন ও ছেলেমেয়েদের (সবাই বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন) জীবন-জীবিকা নিরাপদ ছিল না। শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কার্যালয়ের সামনে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সমাবেশটি ছিল খালেদা সরকারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিরোধী সমাবেশ ও মিছিল। তেরোটি গ্রেনেড হামলা চালানো হয় কিন্তু পরম করুণাময়ের কৃপায় শেখ হাসিনা ও অন্য নেতাদের বহনকারী ট্রাকে নিচে যে গ্রেনেডটি ছোড়া হয় অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে যে গ্রেনেডটি ছোড়া হয় তা বিস্ফোরিত হয়নি। তবে অন দ্য স্পট আইভি রহমানসহ ২৩ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এছাড়া শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি-বোমা চালানো হয় চট্টগ্রাম, নাটোর, জামালপুর, ঢাকা রাসেল স্কয়ার, জিরো পয়েন্ট, ৩২ নম্বরের বাসভবনসহ ২০ বার। বঙ্গবন্ধু এভিনিউর হামলার পরিকল্পনা-পরিচালনা করা হয় জিয়া-খালেদা পুত্র তারেক রহমানের হাওয়া ভবনে বসে। কেবল বহিঃশত্রু নয়, দলের মধ্যেই একশ্রেণির নেতা নানাভাবে দল ও নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে চলেছেন। মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সময় একদল মাঠে নেমেছিল যদিও শেখ হাসিনা তাদের ক্ষমা করে দিয়ে বলেছেন, ‘I forgive but I will not forget.’

 

মুহম্মদ শফিকুর রহমান
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ লিংক

আরও পড়ুন