মুজিব মৌলিক

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

একালের প্রাগ্রসর সমাজ যতখানি বিদ্যাতয়নিক গ্রন্থনির্ভর ও পাঠনির্ভর, ঠিক ততখানি স্বজ্ঞাপ্রসূত বোধনির্ভর কি না প্রশ্নসাপেক্ষ। ফলে আধুনিক সমাজে মৌলিক মানুষের দেখা সহজে পাওয়া না। পাওয়া যায় পাঠ, পূর্ব-জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিচিত্র ভাষ্যমিশ্রণের মাধ্যমে শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত নিরীক্ষক, গবেষক বা প-িত। বিংশ শতাব্দীর তেমন এক তুমুল জ্ঞানবীক্ষণ ও বিদ্যামিশ্রণের যুগে স্বজ্ঞা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে-ওঠা এক মৌলিক মানুষের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাসপূর্ব কাল থেকে ব্যক্তিবাঙালি তথা গণবাঙালির আদল ও এ-যুগের বিশ্ববাঙালির মনোদৈহিক অবয়ব বিবর্তনের বিচারে তাকে এক স্বজ্ঞাধর, মৌলিক ও স্বেচ্ছা চেতন সত্তা হিসেবে শনাক্ত করা যায়। তার অচিন্তিতপূর্ব ব্যতিক্রমী উপলব্ধি আর তার বাস্তবায়নের কারণেই বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি এক বিকল্পবিহীন স্থপতি-সত্তায় উন্নীত হয়ে আছেন। তার কারণও বহুবিধ, আর তা সতর্কভাবে অনুসন্ধানযোগ্য।

আসলে ব্যক্তি ও নেতা পর্যায়ে একমাত্র বঙ্গবন্ধুর নিখুঁত ও নির্বিকল্প উপলব্ধি, তার দ্বিধাহীন ঘোষণা, বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা, রাজনৈতিক কর্মসূচি, তার ধাপানুক্রমিক বাস্তবায়ন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি, সর্বোপরি দেশ ও জাতির জন্য তার চূড়ান্ত আত্মদানের মাধ্যমেই বাঙালি জাতির নব-উত্থান-বাহিত একটি সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।

তার এই কীর্তি থেকে প্রতিভাত হয় তিনি এই উপমহাদেশ তথা বিশ্বের প্রতিটি স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য আলাদা আলাদা স্বায়ত্তশাসিত শাসন-ব্যবস্থার সমর্থক। আর এই বোধ থেকেই তিনি বাংলা ও বাঙালিসহ উপমহাদেশের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর জন্য স্বায়ত্তশাসন কামনা করেছেন। এমনকি উপমহাদেশীয় স্তরেই সব স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বা রাজ্য মিলে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র-কাঠামোও তার প্রত্যাশিত ছিল বলে অনুমিত হয়। দেশভাগের আগে থেকেই বাঙালি তথা প্রতিটি পৃথক জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক এই বাস্তবাশ্রয়ী রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রায়োগিক প্রতিফলন দেখা যায় তার তাবৎ কর্মকান্ডে।

বলা বাহুল্য, ভাষা আন্দোলন, একুশ দফা, এগারো দফা, ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তুরের গণবিস্ফোরণ, তৎপরবর্তী গণভোট, গণতান্ত্রিক বিজয়, স্বাধীনতা ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব থেকে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বঙ্গবন্ধুর আপসহীন ও আদর্শবাদী নেতৃত্বই বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতার জন্য সর্বাপেক্ষা নির্ণায়ক সত্য। এই দীর্ঘ পথযাত্রার যে কোনো পর্যায়ে তার আদর্শ-চ্যুতি বা স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সুদূরপরাহত করে রাখতে পারত। এই একটি কারণেই তিনি অনন্য ও বিকল্পরহিত। আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অচ্ছেদ্য সূত্রে গাঁথা। তাই বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ, বাংলাদেশই বঙ্গবন্ধু। এই উচ্চারণে কাব্যিক আতিশয্য থাকতে পারে; কিন্তু অসত্য নেই।

ইতিহাসপূর্ব কাল থেকে গঙ্গা-পদ্মার এই পলিবাহিত অববাহিকায় মনোদৈহিক মিশ্রবিবর্তনের পথ ধরে ঋদ্ধিমান যে জাতিসত্তা, ২০ শতকে এসে আমরা তার প্রামাণ্য নাম দিয়েছি বাঙালি। এই জাতিসত্তাকে কাম্য প্রক্রিয়ায় ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনুবর্তনের চূড়ান্ত মুহূর্তে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রিক কাঠামোতে উন্নীত করার জন্য বাঙালিকে করতে হয়েছে দৃষ্টান্তরহিত ত্যাগ-স্বীকার; সেই সঙ্গে অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। এতে জীবন বাজি রেখে অংশ নিয়েছে অঙ্গীকৃত প্রকৃত বাঙালি। আর এই বিবর্তন-অনুবর্তন, সংগ্রাম-আন্দোলন ও সম্মুখ-সমরের প্রতিটি যৌক্তিক বাঁকে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাদেরকে তিনি পদে পদে উদ্বুদ্ধ করেছেন আর ধাপে ধাপে মুক্তিযোদ্ধায় পরিণত করেছেন। এভাবে এই জাতি গঠনের চূড়ান্ত-পর্বে তিনিই সঞ্চালক, তিনিই কারুকৃৎ। অতীত ও সমকালের সবকিছু তার অনুঘটক ও নিয়ামক। তিনি নিজে আপাদমস্তক এক অবিসম্বাদিত বাঙালি। তাই চূড়ান্ত স্তরে বাঙালিও তাকে স্বতঃস্ফূর্ত অভিধায় গ্রহণ করেছে জাতির জনক রূপে।

বিজয়ী বাঙালি আজ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে চিরজাগ্রত বাঙালি। মানবিক সহমর্মিতাই তার চালিকাশক্তি। এক মুজিবের রক্তকণিকা জন্ম দিচ্ছে কোটি কোটি মুজিব। চক্রাকারে বেড়ে যাচ্ছে বাঙালির ভূমিপুত্র ও ভূমিকন্যাদের এই সম্মিলিত গণশক্তি।

এই গণশক্তিকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ও তার প্রদর্শিত পথে অব্যাহত রাখতে হবে যে কোনো মূল্যে। এ পথ নতুন এক যুক্তিযুদ্ধের পথ। এটি অন্য এক রণক্ষেত্র, অন্যরকম এক মলাটের পর যুদ্ধ। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন থাকবে বাঙালির এই মুক্তিযুদ্ধ ও যুক্তিযুদ্ধের মিলিত প্রবাহ। সেই যুদ্ধের চিরায়ত অগ্রযোদ্ধা ও সেনাপতির নাম শেখ মুজিব। তিনি এক স্বাধীন জাতির স্বাধীন পিতা। তিনিই আমাদের আদর্শিক ত্রাতা। আগত অনাগত প্রতিটি ব্যক্তিবাঙালির অস্তিত্বে এই আদর্শিক চেতনাস্রোতের চলমানতা চাই।

বাঙালির সেই আদর্শিক চেতনার যুদ্ধে নেই কোনো পরাজয়। বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ চিরকাল মুজিবময়। জয় হোক, জয়। আত্মশক্তিতে প্রবৃদ্ধ বাংলা ও বাঙালির আলোক-চেতনার জয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে এসে মানুষ বঙ্গবন্ধু, সংগ্রামী বঙ্গবন্ধু, রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু, রাষ্ট্রনেতা বঙ্গবন্ধু, রাষ্ট্রদার্শনিক বঙ্গবন্ধু ও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তথা পরিকল্পক বঙ্গবন্ধুর অনন্যতা ও মৌলিকতা আরও বিশদভাবে উন্মোচিত হচ্ছে। ৫৫ বছরের জীবনে চার দশকেরও বেশি তার সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন। মাত্র বছর চারেক বাদ দিলে এর পুরোটাই তিনি কাটিয়েছেন ক্ষমতার বাইরে, জনগণের সঙ্গে সরাসরি ওঠাবসার মাধ্যমে, দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যক্তিপর্যায়ে ভ্রমণ ও গণসংযোগ রচনা করে। এভাবে গণবাঙালির তৃণমূলীয় স্তর থেকে উঠে-আসা বঙ্গবন্ধু জন্মসূত্রের পাশাপাশি নিরন্তর সংযোগসূত্রেও গণবন্ধু হয়ে উঠছিলেন। তাদের মধ্যে সত্যিকার মানবসত্তা, ব্যক্তিসত্তা, জাতিসত্তা ও স্বাধীনসত্তা তথা সর্বব্যাপী মুক্তিসত্তা জাগ্রত করার জন্য পুরোটা জীবনই তিনি ব্যক্তিস্তরে প্রতিটি ব্যক্তিবাঙালির সঙ্গে যোগাযোগ করার এক অসম্ভব অভিযানে নেমেছিলেন। আর তার ফলও ফলেছে বিস্ময়কর। তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ যাদের সঙ্গেই তার এই কারিশম্যাটিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে, তারা তো বটেই, বরং তাদের পুরো পরিবার বা গোষ্ঠী বা গোত্র তার কাছে এই মুক্ত বাঙালিত্ব ও মুক্ত মনুষ্যত্বের দ্বৈত দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। এটিই তার অবিশ্বাস্য জন গণতন্ত্রাতিক মন্ত্র। বলা যেতে পারে জাতিমন্ত্র। এটিই তার সাফল্যের মুখ্য নিয়ামক।

ব্যক্তিমুজিবের এই ব্যক্তিমন্ত্র ও জাতিমন্ত্র বাঙালিকে এতটাই মন্ত্রমুগ্ধ করেছে যে, তিনি তার রাজনীতি-জীবনের তুঙ্গতম মুহূর্তে বাঙালি-জাতির হ্যামিলিনের বাঁশিঅলা হয়ে উঠেছিলেন। এভাবেই তিনি বাঙালির ব্যক্তিবন্ধু থেকে গণবন্ধু ও পরিশেষে বঙ্গবন্ধুতে পরিবর্তিত হয়েছিলেন। আজ জন্মশতবর্ষে এসে যখন তিনি চিরজীবিত অবয়বে এক চিরায়ু সত্তার অধিকারী, তখন তিনি বিশ্বের তাবৎ মুক্তিকামী মানুষেরও এক অনুসরণীয় বন্ধু; ফলে এখন তিনি বিশ্ববন্ধু। মানুষ হিসেবে তার এই ক্রমবিবর্বিত অভিধার সাফল্যের পেছনে আছে তারই এক অনন্য মৌলিক সত্তা, যার অন্য নাম নিজের ও অন্যের জন্য স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। আগেই বলেছি, এই একটি কারণে তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার রাজনীতি না করে, বরং পদে পদে নিজের জীবনকে বাজি রেখে আত্মমুক্তি, বাঙালি মুক্তি ও মানবমুক্তির লক্ষে এক বিকল্পরহিত বাজি লড়েছেন। বলাবাহুল্য, আজ সেই মাঙ্গলিক বাজিতেও তিনিই বিজয়ী। আততায়ীর গুলি ছিনিয়ে নিয়েছে তার শরীরী জীবন; কিন্তু তার চিরজীবী স্বাধীন সত্তা সঞ্চারিত হয়েছে মুক্ত বাঙাল ও মানবতার সামগ্রিক আদলে ও বোধে।

নিজের এই বোধ ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তাকে একই সঙ্গে তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও প্রয়োগবিদে রূপান্তরিত করেছে। তিনি প্লেটো-এরিস্টটল কথিত সেই কিং-ফিলসফার বা ফিলসফার-কিং, যিনি তার নিজের তত্ত্ব নিজেই বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছিলেন। এ নিয়েই তার মুজিবীয় রাষ্ট্রদর্শন। এটি তার বোধ থেকে উৎসারিত হয়ে বাংলাদেশ সংবিধানে চার মৌলনীতি রূপে প্রতিফলিত : জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। প্রতিটি নীতির ক্ষেত্রে তার নিজের ব্যতিক্রমী উপলব্ধি, ব্যাখ্যা ও সমন্বয়-সূত্র শনাক্তযোগ্য। তিনি ব্যক্তি, পরিবার, গোত্র, জাতি ও মানবজাতির মধ্যে হিতকর সম্পর্ক ও সুবণ্টনে অঙ্গীকৃত। গণতন্ত্র তার কাছে ক্ষমতারোহণের অস্ত্র শুধু নয়, বরং গণমানুষের কল্যাণমন্ত্র। সমাজতন্ত্র প্রধানত সামাজিক ন্যায়বিচার ও সম্পদের সুষম বণ্টন। ধর্মনিরপেক্ষতা সব ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, কোনোভাবেই ধর্মহীনতা নয়। তার সংগ্রামেরও দুই প্রধান পর্ব : গণতান্ত্রিক যুক্তিযুদ্ধ ও প্রয়োজনে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এভাবেই তিনি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নৈয়ায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এক মৌলিক মানুষ। ব্যক্তি, জাতি ও মানবজাতি তার বোধে মঙ্গল-নিক্তিতে সুবিন্যস্ত। তার পরিচয় বাঙালি, মানুষ, বঙ্গবন্ধু, বিশ্ববন্ধু ও মানববন্ধু। সব মিলিয়ে তিনি এক সচেতন মৌলিক চিন্তক। তাই তিনি অনন্য। তাই তিনি মুজিব মৌলিক।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা

Link: AlokitoBangladesh | প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২০, ০০:০০

আরও পড়ুন