আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার রূপকার বঙ্গবন্ধু

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

খোকা নামের শিশু, জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। পরবর্তীতে হয়ে উঠেন এক অদম্য নেতা। সেই খোকা আর কেউ নন।তিনি হলেন বঙ্গ দেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর হৃদয়মাঝে সারাজীবন তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বদেশকে। আর তাই যখনই যেখানে গিয়েছেন, মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন সাধারণ মানুষের কথা, কৃষি ও কৃষকের কথা, শ্রমিকের কথা।

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। সবুজ-শ্যামল এই বাংলার প্রকৃতিতে মিশে আছে কৃষি।এই দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষির সাথে জড়িয়ে আছে।বাংলার অর্থনীতি মোটামুটি কৃষির উপর নির্ভরশীল।এই কৃষিকে দেখে দেখেই বেড়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু। খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন কৃষিকে অবলম্বন করে মানুষের জীবনযুদ্ধ।

ফসলের জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম; পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়; সবজি উৎপাদনে তৃতীয়; চাল, চা ও মাছ উৎপাদনে চতুর্থ; আম উৎপাদনে সপ্তম এবং আলু উৎপাদনে অষ্টম। এসব অর্জনের পেছনে যার সবচেয়ে বেশি অবদান; যার সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব; তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।আমাদের এমন এক সময় ছিল বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হতো ।মানুষ জানতোনা কিভাবে উন্নত পদ্ধতিতে ধানের চাষ করতে হয়।

কৃষকরা হতদরিদ্র, আধপেটা, এভাবেই চালিত হচ্ছিল কৃষকদের জীবন।কৃষকদের বিপ্লব বা উন্নতি ছাড়া এই দেশের উন্নতি কোনদিন সম্ভব নয়।এই একটা স্বপ্ন শেখ মুজিবুর রহমান মনে মনে ভালোভবে লালন করেছিল।ত্রিশ লাখ তাজা জীবনের বিনিময়ে প্রাপ্ত প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে সোনালি ফসলে ভরপুর দেখতে চেয়েছিলেন। সে কারণেই স্বাধীনতার পর তিনি ডাক দিয়েছেন সবুজ বিপ্লবের।কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে এমন একটা উদ্যোগের চরম প্রয়োজন ছিল।শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন । স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বঙ্গবন্ধু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশের খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রাথমিক হিসেবে ৩০লক্ষ টন।ছিল না ফসল আবাদ করার প্রয়োজনীয় বীজ, সার, কীটনাশক।

সেচসহ কৃষি উপকরণের ঘাটতি ছিল প্রকট।এসবের জন্য সরকারের ও তহবিল ছিলনা। ঘাটতি পূরণে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক আমদানির মাধ্যমে এবং স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে এবং কৃষি ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার ও খাসজমি বিতরণ করে কৃষিক্ষেত্র উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করেন।

সদ্য স্বাধীন দেশের খাদ্য উৎপাদন ক্ষেত্রকে করেছিল বিপর্যস্ত। নয় মাস যুদ্ধের কারণে কৃষক মাঠে ফসল ফলাতে সমস্যায় পড়ে। বহু কৃষককে ঘরবাড়ি ত্যাগ করতে হয় বলে অনেকেই চাষাবাদ করতে পারেনি। মানুষের মুখে রোজ দু’বেলা আহার জোগানো ছিল সে সময়ের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।

বঙ্গবন্ধু ভাবতেন সবার আগে দরকার খাদ্যের। খাদ্যের নিশ্চয়তা না দিতে পারলে সব উন্নয়ন কার্যক্রম বিফলে যাবে।এমতাবস্থায় দরকার ছিল একজন আদর্শ নেতা।যে এই দেশের কৃষিকে উন্নতির উচ্চত শিখরে নিয়ে যেতে পারবে।এমন সময় শেখ মুজিবুর রহমানের মাথায় কৃষি উন্নয়নের কথা ঘুরপাকা খেতে থাকে।এমতাবস্থায় তিনি কৃষি উন্নয়নের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেন। সেগুলো হলো

কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু।। এ কারণে কৃষি কাজে জড়িত উপকৃত হয়েছেন। খাজনা মওকুফের ফলে কৃষকরা নব-উদ্যোমে কাজ করে গেছেন।বঙ্গবন্ধুর আমলে এই খাজনা বিহীন কাজ করেন কৃষক শ্রমিকরা।বঙ্গবন্ধু এক ব্যক্তির নামে ১০০ বিঘার উপরে জমি থাকাতে নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি সুষম বণ্টন শিখিয়েছেন।অতিরিক্ত জমি ভূমিহীনদের মাঝে বণ্টন করে ভূমিহীনদের চাষাবাদ করার সুযোগ তৈরি করে দেন। এভাবে কৃষি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছেন। পুঁজিবাদী সাম্যব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করেছেন। গ্রামীণ কৃষকদের সাহায্যের জন্য মুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রায় ২২ লাখের বেশি পরিবারকে পুনর্বাসন করেছিলেন।কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নে তিনি প্রথম বাজেটে কৃষিখাতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করেন। বাজেটে ভর্তুকি দিয়ে বিনামূল্যে কীটনাশক ও সার সরবরাহ করেন। ফলে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে কৃষি উৎপাদন অতীতের যেকোনো সময় থেকে অনেক বেশি উৎপাদিত হয়েছিল। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মী নিয়োগ করেছিলেন।কৃষিপণ্য বিশেষ করে ধান, পাট, তামাক আখের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ন্যূনতম ন্যায্য মূল্য বেধে দিয়েছিলেন। গরিব কৃষকদের রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন। সবুজ বিপ্লব কর্মসূচির আওতায় খাদ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

এরপর থেকে বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে আসতে শুরু করেছে।বর্তমানে আমাদের কৃষি ব্যবস্থা সারা বিশ্বে আলোড়িত। আজকের আধুনিক প্রযুক্তির কৃষি বঙ্গবন্ধুর অবদান।

ফসলের জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম; পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়; সবজি উৎপাদনে তৃতীয়; চাল, চা ও মাছ উৎপাদনে চতুর্থ; আম উৎপাদনে সপ্তম এবং আলু উৎপাদনে অষ্টম। এসব অর্জনের পেছনে যার সবচেয়ে বেশি অবদান; যার পরিকল্পনা ও স্বপ্নের সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব; তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের।

১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাকসুর এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিবিদদের চাকরি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন। ওই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ” আপনারা নিশ্চয় রাগ করবেন না, দুনিয়া ভরে চেষ্টা করেও আমি চাল কিনতে পারি না। চাল পাওয়া যায় না। যদি চাল খেতে হয় আপনাদের চাল পয়দা করে খেতে হবে। শতকরা ৯০ জন কৃষক গ্রামে বাস করেন। গ্রামের দিকে যেতে হবে। আমার ইকোনমি যদি গণমুখী না করতে পারি এবং গ্রামের দিকে যদি না যাওয়া যায়, সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না, কৃষিবিপ্লব হবে না।’।আজ এর ফলেই চাল উৎপাদনে বাংলা অনেকাংশে এগিয়ে।

আব্দুল্লাহ আল নোমান | লেখক, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Link: The Daily Campus |  ১৫ আগস্ট ২০২০, ১১:০২

আরও পড়ুন