শেখ রেহানা: মিথ্যার দেয়ালে প্রথম আঘাতকারী এক সংগ্রামী জীবনের উপাখ্যান

সম্পাদনা/লেখক: Zakir Hossain

১৯৭৫ সালের এক অভিশপ্ত ভোরে তারা দুজনই হারিয়েছিলেন পরিবারের সবাইকে। সেই ভয়ংকর সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৭ হাজার ৭শ ৩০ কিলোমিটার দূরে বেলজিয়ামে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচেছিলেন দুই বোন শেখ রেহানা এবং শেখ হাসিনা। বলা বাহুল্য সেই থেকে কিছুই আর আগের মত থাকেনি এই দুই নারীর জীবনে। সবকিছু বদলে গিয়েছে। তারুণ্যের যে সময়টিতে তার উচ্ছ্বলতার স্রোতে ভেসে যাওয়ার কথা সে সময়েই তাকে থমকে যেতে হয়েছে। যেখানে জীবনের নিশ্চয়তাই ছিল অনিশ্চিত সেখানে জীবনের আনন্দ উপভোগ করবার মত অবস্থা তার ছিল না কখনোই। জীবন নিয়ে ভয় আতঙ্ক কখনোবা তৎকালীন নোংরা রাজনীতির কড়াল গ্রাস তাকে তাড়া করে ফিরেছে জীবনভর। কিন্তু সংগ্রামের অমোঘ নেশা তাকে বাঁচিয়েছে বারংবার। তিনি জেগে উঠেছেন, ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, জবাব দিয়েছেন, জয়ী হয়েছেন জীবনের অসম যুদ্ধে।

১৫ আগস্টের নৃশংসতা শেখ রেহানাকে যেমন দুর্বল করেছিল তেমনিভাবে আরেকদিক থেকে একরোখা এবং গভীরভাবে নিবেদিতপ্রাণও করে তুলেছিল। জীবিত দুই বোনকেই যে তাদের পরিবারের হত্যার বিচার করতে হবে তা তারা কড়ায় গণ্ডায় বুঝতে পারেন। ২০১৩ সালে লন্ডনে একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ব্যাপারে খোলামেলাভাবেই অনেক কথা বলেন শেখ রেহানা। কীভাবে একসময় প্রতিদিন যারা শেখ রেহানার কাছে আসত তারাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন সেসব দুঃসহ স্মৃতির কথা উঠে আসে সেই সাক্ষাতকারে। সেখানে তিনি সাফ জানিয়েছেন, তাজউদ্দীন ‘কাকা’র সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কোন দূরত্ব ছিল না। এছাড়াও খন্দকার মোশতাক যে চরম পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে সেকথাও তিনি বলেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন- ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তো ব্রুটাস, মীর জাফরদের আবির্ভাব ঘটে, মোশতাকের আগমনও আমরা সেভাবেই দেখি। রেহানা বলেন, আমার দাদির মৃত্যুর পর মোশতাকের সেই অস্বাভাবিক কান্না এখনো আমার চোখে ভাসে। আব্বাসহ আমরা সবাই ছিলাম শোকে কাতর। কিন্তু একমাত্র মোশতাকই তখন মাঠিতে গড়াগড়ি করে কান্নাকাটি করছেন, যা অনেককেই অবাক করেছে। তখন তো আর বুঝতে পারিনি- আব্বার বিশ্বাসে ঢুকতে এ ছিল তার অভিনয়।

বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর যে মিথ্যা আর কলুষের দেয়াল অন্ধকার করে রেখেছিল গোটা জাতিকে- সেই মিথ্যার দেয়ালে তিনিই প্রথম আঘাত করেন। ১৯৭৯ সালের উত্তাল সময়ে যখন জননেত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন, তখন স্টকহোমে সর্ব ইউরোপীয় বাকশালের সম্মেলনে শেখ রেহানা প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন শেখ হাসিনার পক্ষে। সেখানেই তিনি জীবনে প্রথমবারের মত কোন রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সেবারই প্রথম আন্তর্জাতিক কোন সম্মেলনে ৭৫’র কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। সেই সম্মেলনে রাখা বক্তব্যে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘ মহাসচিব, অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের প্রধানদের কাছে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচার চান।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার সেই আবেগঘন বক্তব্য আজো বিশ্ববাসী স্বমহিমায় লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে তা রয়ে গেছে চিরন্তন উদাহরণ হিসেবে।