ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধু ও শেখ কামাল : শামসুজ্জামান শামস

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল
স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির শত শত বছরের পরাধীনতার গøানি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাই ছাত্র জীবন থেকেই বিদেশি শাসক-শোষকদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন প্রতিবাদী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না, আরো শত শত বছর বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শিকল পরে মৃত্যুর যন্ত্রণায় দিন কাটাতে হতো। কেবল স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ এই বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের অজপাড়াগাঁ টুঙ্গিপাড়ায় যেদিন শেখ মৌলবী লুৎফর রহমানের ঘর ও বেগম সাহেরা খাতুনের কোল আলো করে যে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েছিল সেদিন কেউ কি জানতো যে এই শিশুই বাংলার ভাগ্যাহত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুক্তির দূতরূপেই আবির্ভূত হবেন একদিন।

বঙ্গবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় গ্রামের বিদ্যালয়ে। তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন এক দীর্ঘাঙ্গী মানুষ। ছাত্রাবস্থায় তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশিত হতে থাকে। শৈশব, কৈশোরেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। এরপর থেকে শুরু হয় তাঁর বিপ্লবের জীবন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পর তিনি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। তাঁর শৈশব-বাল্য-কৈশোর-প্রথম যৌবনের লালন গ্রামীণ পরিমণ্ডলের ওই গোপালগঞ্জে। কৃষির আর নদীর বাংলায় ভিত তৈরি হয়েছিল শেখ মুজিবের। স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী। ক্রীড়া বিশ্বে বাংলাদেশ আজ আপন মহিমায় এগিয়ে চলছে। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, দাবা, কাবাডি, গলফ, ভলিবল, জুডো-কারাতেসহ সব খেলায়ই বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা সাফল্য অর্জন করছে। ক্রিকেটে বাংলাদেশ ক্রিকেট পরাশক্তিদের মাটিতে নামিয়ে আসছে অনায়াসে। স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে ফুটবলার ছিলেন বলে ক্রিকেটের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কমতি যে ছিল তা কিন্তু নয়। ক্রিকেটের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার তাগিদে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠন করেন- যা বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি নামে পরিচিত। দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন- যা এখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নামে পরিচিত। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পরিচালিত এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। এটি বাংলাদেশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাধীন ৪৩টি ভিন্ন ভিন্ন খেলাধুলা বিষয়ক সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সংক্ষেপে বাফুফে, বাংলাদেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা এটি। বাফুফের যাত্রাও শুরু হয়েছে ১৯৭২ সালে। ক্রীড়াপ্রেমী বলেই সব খেলার প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুর্বলতা ছিল। ফুটবলের প্রতি জাতির জনকের দুর্বলতা একটু বেশি ছিল। কারণ নিজেও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে খেলেছেন। ওয়ান্ডারার্সের জার্সি গায়ে জড়িয়ে মাঠ মাতালেও ভলিবল ও হকি খেলেছেন তিনি। স্বাধীনতার পর দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতার কমতি ছিল না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপ্রেরণা আর আন্তরিক সহযোগিতায় স্বাধীন বাংলাদেশে ফুটবল মাঠে গড়ায় মাত্র দুমাসের ব্যবধানে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তারকা ফুটবলারদের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ একাদশ ও রাষ্ট্রপ্রতি একাদশের মধ্যে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালের মে মাসে ঢাকায় খেলতে আসে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা দল কলকাতা মোহনবাগান। প্রথম ম্যাচে কলকাতা মোহনবাগান ঢাকা মোহামেডানকে হারালেও পরের ম্যাচে হোঁচট খায় সফরকারীরা। দ্বিতীয় ম্যাচে মোহনবাগান ঢাকা একাদশের মোকাবিলা করে। খেলার আগে ঢাকা একাদশের খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছিলেন জাতির জনক। ম্যাচের দিন প্রধান অতিথি হিসেবে মাঠে উপস্থিত থেকে খেলোয়াড়দের মনোবল চাঙ্গা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে সেই দিন দুর্দান্ত এক জয় উপহার দিয়েছিলেন ফুটবলাররা। ঢাকা একাদশ মোহনবাগানকে ১-০ গোলে হারিয়েছিল। ঢাকা একাদশের পক্ষে সেই দিন জয়সূচক গোলটি করেছিলেন বর্তমানে সাফ এবং বাফুফের সভাপতি কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে খেলতে আসে রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো ক্লাব। ফুটবলপ্রেমী হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছোট ছেলে শেখ রাসেলকে নিয়ে ভিআইপি গ্যালারিতে বসে ঢাকা একাদশ এবং রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো ক্লাবের খেলা উপভোগ করেন। ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়েছিল ফুটবল দল। খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করতেই জাতির জনক প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় দলের বিদায়ক্ষণে গণভবনে ডেকেছিলেন। খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এমনি সম্ভব নয়। দলের সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ছবিও তুলেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ কামাল

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শেখ কামালকে বাংলাদেশের আধুনিক ফুটবলের পথিকৃৎ বলা হয়। তার প্রতিষ্ঠিত আবাহনী ক্রীড়াচক্র আজ দেশ-বিদেশে পরিচিত একটি ক্লাব। ক্লাব ভবন থেকে শুরু করে সব কিছুতেই শেখ কামাল আধুনিকতার নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন। বিশেষ করে ফুটবল খেলায় তিনি শুধু বাংলাদেশ কেন, গোটা উপমহাদেশেই পশ্চিমা স্টাইলে বিপ্লব এনেছিলেন। ১৯৭৩ সালে আবাহনীর জন্য বিদেশি কোচ বিল হার্টকে এনে ফুটবলপ্রেমীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন! তখন ক্লাব তো দূরের কথা, এই উপমহাদেশে জাতীয় দলের কোনো বিদেশি কোচ ছিল না। ১৯৭৪ সালে আবাহনী যখন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘আইএফএ’ শিল্ড টুর্নামেন্ট খেলতে যায়, তখন আবাহনীর বিদেশি কোচ আর পশ্চিমা বেশভুষা দেখে সেখানকার কর্মকর্তা আর সমর্থকদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গিয়েছিল। আজ উপমহাদেশে জাতীয় দল থেকে শুরু করে ক্লাব পর্যায়ে বিদেশি কোচের ছড়াছড়ি। অথচ শেখ কামাল তা করেছিলেন সেই ১৯৭৩ সালে। আজ শেখ কামাল বেঁচে থাকলে খেলাধুলা বিশেষ করে ফুটবলে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশে পরিণত হতো বাংলাদেশ। আমাদের দেশের ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার মান উন্নয়নে শেখ কামাল অক্লান্ত শ্রম দিয়েছিলেন। ক্রীড়া জগতে তিনি রেখেছেন অপরিসীম অবদান। পাশাপাশি নতুন খেলোয়াড় তৈরি করার জন্য প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে তুলেছিলেন। তারুণ্যের প্রতীক শেখ কামাল অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। তার মধ্যে একটি নাটক পশ্চিম বাংলার কলকাতায় মঞ্চস্থ হয়েছে। এদিকে নাট্য অভিনয় ছাড়া তিনি ভালো সেতারবাদক ছিলেন। ছায়ানটে সেতারবাদন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বলিষ্ঠ সংগঠক শেখ কামাল বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন স্পন্দন শিল্পীগোষ্ঠী। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্লু’ দেশবরেণ্য অ্যাথলেট সুলতানা খুকুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

ছোটবেলা থেকেই শেখ কামাল ছিলেন প্রচণ্ড ক্রীড়ানুরাগী। শাহীন স্কুলে পড়ার সময় স্কুল একাদশে নিয়মিত ক্রিকেট, ফুটবল, বাস্কেটবল খেলতেন। আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে শেখ কামাল প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে নিয়মিত খেলেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ কামাল শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। বন্ধুদের নিয়ে ধানমন্ডির সাতমসজিদ এলাকায় গড়ে তোলেন ‘আবাহনী ক্রীড়াচক্র’। শেখ কামাল শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল তার। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়া সংগঠন আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা। বহুমাত্রিক অনন্য সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী তারুণ্যের প্রতীক শহীদ শেখ কামাল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন নিবেদিত, সংগ্রামী, আদর্শবাদী কর্মী ও সংগঠক হিসেবে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। শেখ কামাল স্বাধীনতা-উত্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশ নেন। পাশাপাশি সমাজের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে সমাজ চেতনায় উদ্বুদ্ধকরণে মঞ্চ নাটক আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি একেবারেই প্রথম সারির সংগঠক ও উদ্যোক্তা ছিলেন। শেখ কামাল ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অভিনেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শহীদ শেখ কামাল ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএ অনার্স পাস করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের আগে তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষা দিয়েছিলেন। যুদ্ধকালে তিনি লে. পদে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে পুনরায় শিক্ষা জীবনে ফিরে এসে শেখ কামাল পড়াশুনায় মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ক্রীড়াঙ্গনে আজ যে অরাজকতা বিরাজ করছে কামাল বেঁচে থাকলে তা আর হতো না। তার যোগ্য নেতৃত্বে দেশের প্রতিটি খেলা অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারত।

Link: Bhorerkagoj মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট ২০১৭

আরও পড়ুন