সেই স্কুল এই কলেজ

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

লম্বা ছিপছিপে মাথায় ঘন কালো চুল, ব্যাক ব্রাশ করা একটি ছেলে হঠাৎ হাজির বাংলার তখনকার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সামনে। ১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তিনি। মন্ত্রী জানতে চান, কী চাও? কোনো দ্বিধা না নিয়ে ছেলেটির উত্তর, ‘আমরা গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশনারি হাই স্কুলেরই ছাত্র। স্কুলের ছাদে ফাটল ধরেছে। ছাদ সংস্কারের আর্থিক সাহায্য না দিলে রাস্তা ছাড়া হবে না।’

ছেলেটির সৎসাহসে মুগ্ধ হয়ে ছাদ সংস্কারের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়ে যান শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। সেই ছেলেটি আর কেউ নন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। এই মিশন স্কুলে অনেক স্মৃতি তাঁর। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও নজর কাড়েন শেখ মুজিবুর রহমান। গড়ে তোলেন শক্তিশালী একটি ফুটবল দল। ফুটবলের পাশাপাশি তিনি খেলতেন হকি, হাডুডু, ভলিবল ও বাস্কেটবল। ভালো খেলোয়াড়দের জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন বিনা পয়সায় পড়াশোনার।

বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমানও ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারির দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে। শেখ মুজিব তখন মিশন স্কুলের অধিনায়ক। প্রায়ই ফুটবল ম্যাচ হতো অফিসার্স ক্লাব ও মিশন স্কুল দলের। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, ‘আব্বার টিম ও আমার টিমের যখন খেলা হতো তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত। আমাদের স্কুল টিম খুব ভালো ছিল। মহকুমায় যারা ভালো খেলোয়াড় ছিল, তাদের এনে ভর্তি করতাম এবং বেতন ফ্রি করে দিতাম। অফিসার্স ক্লাবের টাকার অভাব ছিল না। খেলোয়াড়দের বাইরে থেকে আনত। সবাই নামকরা খেলোয়াড়। বৎসরের শেষ খেলায় আব্বার টিমের সঙ্গে আমার টিমের পাঁচ দিন ড্র হয়। আমরা তো ছাত্র; এগারোজনই রোজ খেলতাম, আর অফিসার্স ক্লাব নতুন নতুন প্লেয়ার আনত।’

‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ বইয়ে দাদা লুৎফর রহমান ও বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের দলের খেলার কথা উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও, “আব্বা যখন খেলতেন, তখন দাদাও মাঝে মাঝে খেলা দেখতে যেতেন। দাদা আমাদের কাছে গল্প করতেন যে, ‘তোমার আব্বা এত রোগা ছিল যে, বলে জোরে লাথি মেরে মাঠে গড়িয়ে পড়ত।’ আব্বা যদি ধারেকাছে থাকতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতেন। আমরা তখন সত্যিই খুব মজা পেতাম।’’

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে স্বাভাবিকভাবে আলাদা একটা জায়গা করে নিতে পারত মিশন স্কুলটি। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই স্কুল। একই জায়গায় এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ’। এই বিবর্তনটা হয়েছে ’৫০ দশকে। প্রথমে এটা ছিল জিন্নাহ কলেজ। দেশ স্বাধীনের পর নাম বদলে বাংলাদেশের প্রথম সরকারি কলেজের মর্যাদা পায় মিশন স্কুলের জায়গায় গড়ে ওঠা ‘বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ’। ত্রিশের দশকে একই সঙ্গে ছিল মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট আর সীতানাথ ইনস্টিটিউট। কলেজ হয়ে যাওয়ার পর দুজনের নামের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে করা হয় নতুন স্কুল ‘এসএম মডেল স্কুল’।

বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ আর এসএম মডেল স্কুল দুই প্রতিষ্ঠানই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আয়োজন করেছে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট। সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান জানালেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সময়ের মতো জমজমাট খেলার আয়োজন হয়তো আমরা করতে পারি না। অফিসার্স ক্লাবের সঙ্গে আগে যেমন খেলা হতো এখন সেটা হয় না। তবে আন্ত হাউস টুর্নামেন্টগুলো হয় নিয়মিত।’ গোপালগঞ্জ আন্ত স্কুল টুর্নামেন্টের জেতা ট্রফিটা হারানো নিয়ে কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আলীর হতাশা, ‘এই ট্রফিটা স্মারক হয়ে থাকতে পারত। সম্ভব হলে এর রেপ্লিকা বানানোর চেষ্টা করব আমরা।’

Link: Kalerkantho | ১৭ মার্চ, ২০২০

আরও পড়ুন