খেলোয়াড় বঙ্গবন্ধু সংগঠক বঙ্গবন্ধু

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ভালো খেলোয়াড়ও। নিজের স্কুলের ফুটবল দলে করেছেন অধিনায়কত্ব। ঐতিহ্যবাহী ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে তাঁর নাম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগেই গঠিত হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডসহ অন্য ফেডারেশনগুলো। অনেকের কাছেই ক্রীড়াঙ্গনের এই বঙ্গবন্ধু অপরিচিত। আজ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে খেলার জগতের বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারে খেলার চর্চা, সাবেক ক্লাব, স্কুল ও জেলার ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাস ও বর্তমানের মেলবন্ধন করেছেন রাহেনুর ইসলাম

তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বাংলাদেশের জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হতে পারতেন ভালো ফুটবলারও। নাম উজ্জ্বল করতে পারতেন কাবাডি বা ভলিবলে। অথচ খেলোয়াড় বঙ্গবন্ধুর কথা তরুণ প্রজন্মের অনেকের অজানা।

বঙ্গবন্ধুর ক্রীড়াপ্রেম ও দেশপ্রেম একসুতায়ই গাঁথা। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়ার সময় ফুটবল মাঠ দাপিয়ে বেড়াতেন তিনি। খেলতেন ভলিবল আর হাডুডু। ছিলেন মিশন স্কুলের ফুটবল অধিনায়ক। এই স্কুলের হয়ে বাবা লুৎফর রহমানের অফিসার্স ক্লাবের বিপক্ষে খেলেছেন বেশ কিছু ফুটবল ম্যাচ, যা উপভোগ করতেন উত্সুক জনগণ। এমন প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের জন্য ভালো খেলোয়াড়দের মিশন স্কুলে বিনা পয়সায় পড়াশোনার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন তিনি। খেলতে যেতেন বিভিন্ন শিল্ড টুর্নামেন্টে। গোপালগঞ্জ আসার আগে টুঙ্গিপাড়ায় ভালো হাডুডু খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিতি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের।

‘খোকা’ ডাকনামের বঙ্গবন্ধু টুঙ্গিপাড়ার পাশাপাশি হাডুডু খেলতে যেতেন পাশের শহর বরিশাল আর যশোরে। দুই শিক্ষক ছিলেন তাঁর খেলাধুলা ও রাজনীতির অনুপ্রেরণা। এ নিয়ে গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান জানালেন, ‘আব্দুল মজিদ স্যার ও বিপেন স্যার ছাত্রজীবনের অনেকখানি জুড়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর। তাঁরা খেলাধুলার পাশাপাশি রাজনীতিতেও উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। অথচ ইতিহাসে তাঁদের নাম নেই।’

‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ : আলোকচিত্রের অ্যালবাম’ বইটিতে গোপালগঞ্জ আন্ত স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপাজয়ী দলের খেলোয়াড়দের ট্রফিসহ ছবি আছে একটা। অনেকে ভুল করে বলেন এটা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ছবি! বাস্তবতা হচ্ছে আন্ত স্কুল টুর্নামেন্টের ট্রফি নিয়েই সামনের সারিতে বসা তৃতীয়জন মিশন স্কুলের অধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর ঠিক পাশে গোলরক্ষক বতু মিয়া। পঞ্চমজন বঙ্গবন্ধুর অঙ্কের শিক্ষক মনোরঞ্জন অধিকারী। তবে ঐতিহাসিক রুপালি ট্রফিটার খোঁজ নেই কোনো। সেই স্কুল এখন সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ। সেখানেও এ প্রতিবেদকসহ খোঁজ চলল দীর্ঘক্ষণ; কিন্তু হদিস নেই। ফাইনালে রেফারির বাঁশি বাজানো গোপাল কৃষ্ণের ছেলে ও গোপালগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিবশঙ্কর অধিকারী বলছিলেন, ‘১৯৭৭ সালের ভয়াবহ ঝড়ে ট্রফিটা নষ্ট হয়ে গেছে অথবা হারিয়ে গেছে। এটা খুঁজে পেলে দারুণ ব্যাপার হবে।’ স্কুলজীবন শেষে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যান শেখ মুজিবুর রহমান।

রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে বাংলার মাটিকে মুক্ত করেছিলেন এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে এই দেশকে পুনর্গঠনের আরেক ‘যুদ্ধ’ শুরু হয় মুজিবুর রহমানের। সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশকে সাজানোর সেই পদক্ষেপে বাদ যায়নি ক্রীড়াঙ্গনও। তরুণদের বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচাতে জোর দেন ক্রীড়াঙ্গনেই। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় হাডুডুরই অন্য সংস্করণ কাবাডি জাতীয় খেলার মর্যাদা পায় স্বাধীন বাংলাদেশে। খেলাটি বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকায় কিছুদিন আগে পর্যন্ত মর্যাদার এশিয়ান গেমসে অন্তত একটি পদক আসত কাবাডি থেকে। কর্তাদের অবহেলায় ‘নিশ্চিত’ সেই পদক হাতছাড়া এখন।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু গঠন করেন ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা’, এর বর্তমান নাম জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। দেশের সব ক্রীড়া সংস্থাই এর অধীনে। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড’, যা নাম বদলে এখন ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’। বিশ্বের সেরা পাঁচ ধনী ক্রিকেট বোর্ডের একটি এই বিসিবি। ফুটবলের উন্নয়নে ১৯৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন’, যা পেয়ে যায় এএফসি ও ফিফার স্বীকৃতি। সে সময় একে একে গড়ে ওঠে সাঁতার, হকি, ভলিবল, অ্যাথলেটিকস, টেনিস ইত্যাদি ফেডারেশন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই নিবেদিত ক্রীড়া সংগঠকরা এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পরপরই শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম) অনুষ্ঠিত হয়েছিল মুজিবনগর একাদশ ও প্রেসিডেন্ট একাদশের প্রীতি ম্যাচ। তিনি গ্যালারিতে বসে দেখেছিলেন নিজ দলের ২-০ গোলের হার! তবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন দুই দলের খেলোয়াড়দেরই।

বাংলাদেশ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন এখন বাফুফের সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের বন্ধু হওয়ার সুবাদে বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল তাঁর। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর ফুটবলপ্রেম নিয়ে স্মৃতিকাতর সালাউদ্দিন, ‘দেশে বা বিদেশে যেখানেই আমরা খেলতে গিয়েছি, বঙ্গবন্ধু খোঁজখবর নিয়েছেন আমাদের। আমরা একবার আইএফএ শিল্ড খেলতে কলকাতা গিয়েছিলাম। শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের ফোনে উৎসাহ দিয়ে জানান, শিরোপা জিতলে খেলোয়াড়দের বিমানবন্দর থেকে নিয়ে পুরো ঢাকা শহর ঘোরানো হবে ঘোড়ার গাড়িতে। ১৯৭২ সালে কলকাতার মোহনবাগান আর ১৯৭৩ সালে রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো ক্লাব খেলতে আসে ঢাকায়। হাজারো কাজ বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধু দুটি ম্যাচই উপভোগ করেছেন গ্যালারিতে বসে। ফুটবলে বা অন্য কোনো খেলায় ভালো করলে নতুন স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশকে যে সবাই সমীহ করবে, এটা জানতেন তিনি। সব সময় বলতেন খেলা আর রাজনীতিকে আলাদা রাখতে।’ এ জন্যই শেখ কামাল যখন আবাহনী ক্লাব গড়ে তুলছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুর কড়া নির্দেশ, ‘রাজনীতিবিদদের ক্লাবের সঙ্গে জড়িত রাখবে না।’

ক্রিকেট সামগ্রীর কর তখন ছিল ১৩০ শতাংশ। এ নিয়ে ক্রীড়া সংগঠকরা বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলে করের অঙ্ক কমাতে তখনকার অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে নির্দেশ দেন তিনি। অলিম্পিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে পর্যবেক্ষক হিসেবে পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার আহ্বায়ক কাজী আনিসুর রহমানকে। ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিখিল ভারত গ্রামীণ ক্রীড়ায় অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে পাঠিয়েছিলেন তখনকার মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদিকা লুত্ফুন নেসা বকুলের নেতৃত্বে একটি দল।

ক্রীড়াঙ্গনে অবদান রাখা খেলোয়াড় ও তাঁদের পরিবারের সাহায্যের জন্য ১৯৭৪ সালের ৬ আগস্ট ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করান শেখ মুজিবুর রহমান। ১৫ আগস্ট কালরাতে বিপথগামী কিছু সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হওয়ায় আলোর মুখ দেখেনি এ প্রস্তাব। তবে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর। তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালে পাস করেন ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন-২০১১’। এ প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে নিজেদের।

১৯৭৫ সালে ঘৃণ্য সেই হত্যাযজ্ঞ না ঘটলে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের যে দুরবস্থা, তা হয়তো দেখতে হতো না কখনো। যে দেশের জাতির পিতা নিজেই ছিলেন খেলোয়াড় আর দক্ষ সংগঠক, সে দেশের ক্রীড়াঙ্গন পিছিয়ে থাকবে কেন?

Link: Kalerkantho | ১৭ মার্চ, ২০২০

আরও পড়ুন