৪৪ বছর ধরে ১৫ আগস্টে ৪ জনের রোজা-উপোস!

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অনেক সদস্য এবং জাতীয় ৪ নেতাকে  নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদ করায় সে সময়ে জেল খেটেছিলেন নাটোরের পাঁচ জন মুজিব প্রেমিক। তাদের একজন  ইতোমধ্যে মারা গেছেন। অপর চারজনের মধ্যে একজন মুসলিম। তিনি গত ৪৪ বছর ধরে জাতির জনকসহ তার পরিবারের সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় ১৫ আগস্ট রোজা রাখেন, বাকিরা নিজ ধর্ম অনুসারে এই দিনটিতে থাকেন উপোস। শুধু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে কোনও প্রতিদানের আশা ছাড়াই এমন দৃষ্টান্ত একেবারেই বিরল।

গুরুদাসপুর উপজেলার চাঁচকৈড় বাজারের বটকৃষ্ণ পালের ছেলে শ্রী অশোক কুমার পাল ১৯৭৫ সালে ছিলেন ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষার্থী। তার অপর দুই বন্ধু ও সহপাঠী বর্মণ এবং নির্মল কর্মকারও স্থানীয় জোহা কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে একই শ্রেণির পরীক্ষার্থী ছিলেন।

অশোক কুমার জানান, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যার কথা জানার পর তারা তিন বন্ধু চাঁচকৈড় বাজারে এর প্রতিবাদে স্লোগান দিতে থাকেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই, রক্তের বদলে রক্ত চাই-এমন স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেন চাঁচকৈড় বাজার। তাদের আশা ছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ, জেলা আওয়ামী লীগসহ পুরো বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসবে। কিন্তু তেমন কোনও ঘটনা না ঘটায় হতাশ হন তারা। উল্টো ওই রাতেই পুলিশ তাদের খোঁজ করতে থাকলে তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। বেশ কিছু দিন পর বাড়ি ফেরেন তারা। এরপর ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরের দিন তারা আবারও প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তিন বন্ধু জীবনের সকল মায়া ত্যাগ করে একলা চলো নীতিতে হাতে লেখা পোস্টার ও লিফলেট তৈরি করেন। ৬ নভেম্বর চাঁচকৈড় বাজারের আনাচে-কানাচে  দেড়শ পোস্টার ও লিফলেট বিতরণসহ দেয়ালে সেঁটে দেন তারা। খবর পেয়ে পুলিশ তাদের আটক করে নিয়ে যায়। এরপর কলেজ অধ্যক্ষের লিখিত কাগজ পাওয়ার পর পরীক্ষায় অংশ নিতে ১৬ নভেম্বর অশোক কুমার পাল অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। পরীক্ষা শেষে ৯ ডিসেম্বর তাকে রাজশাহী কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে অন্য দুই বন্ধু হারু ও নির্মল টাকার অভাবে পরীক্ষাই দিতে পারেননি।

২৯ মাস ডিটেনশনে থাকার পর মার্শাল ল’-এ তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। ডিস্ট্রিক্ট জজ কোর্ট স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের রায় হলে ২৯ মাস শেষে তাদের তিন বন্ধুর আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২শ’ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও দুই মাসের কারাদণ্ড হয়।

প্রায় সাড়ে তিন বছর জেল খাটার পর তারা বের হয়ে আসেন।

এরপর আর তাদের তিন বন্ধুর কারোরই লেখাপড়া হয়নি।

অশোক কুমার বর্তমানে গানের টিউশনি করেন, প্রণব বর্মণ ইলেকট্রনিক্স দোকানে আর নির্মল কর্মকার হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী।

নির্মল জানান, ১৯৬৯ সালে গুরুদাসপুর পাইলট হাইস্কুল মাঠে বঙ্গবন্ধু এক জনসভায় আসেন। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও জীবনযাপন, স্বপ্ন সবকিছু দেখেই তারা মুগ্ধ হন।

এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের অন্তরে শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সকল ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে তারা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্য এবং জাতীয় চার নেতা হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্য এবং চার নেতাকে হত্যার পরের বছর থেকেই প্রতিবছর তারা উপোস থাকেন।

এক প্রশ্নের জবাবে এই তিন জন দাবি করেন, যে স্বপ্ন ও আশা নিয়ে বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা করতে চেয়ে ছিলেন তা আজও পূর্ণ হয়নি। তাদের শিক্ষাজীবন আর সকল স্বপ্ন ধূলিসাৎ হলেও নিজ সন্তানরা একটু সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারলেও তারা মরে শান্তি পেতেন।

এই তিন জন বাদে নাটোরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রতিবাদ করে গ্রেফতার হওয়া অপর দুই ব্যক্তি হচ্ছেন তদানীন্তন সংসদ সদস্য প্রয়াত সাইফুল ইসলাম এবং বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুরের সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস, যিনি তখন ছিলেন ছাত্রনেতা।

.

“>বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

তাদের রাজশাহী কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এছাড়াও একই কারাগারে তাদের সঙ্গে পাশাপাশি কক্ষে বন্দি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, নওগাঁর আব্দুল জলিলসহ অনেকেই।

সে সময়ের কথা জানতে চাইলে সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস স্মৃতিচারণ করে জানান, বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার সদস্যদের হত্যার প্রতিবাদ করায় ১৭ আগস্ট রাতে তিনি গ্রেফতার হন। সেই সময়ে নাটোরের সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ তারা ৫ জন (ওপরের তিন জনসহ), নওগাঁর আব্দুল জলিল, রাজশাহী বাগমারা সরকার আমজাদও জেল খেটেছেন। এর বাইরে নাটোর জেলা এমনকি সারা বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী যারা এখন বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে মুখে ফেনা তোলেন তাদের বেশিরভাগই গা ঢাকা দেন বলেও দাবি করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা তার আদর্শ গ্রহণ এবং বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্য, জাতীয় চার নেতাকে হত্যার প্রতিবাদ করায় তিনি মোট ৫৯ মাস ১৭ দিন জেল খেটেছেন।

আব্দুল কুদ্দুস জানান, বঙ্গবন্ধু, তার পরিবারের সদস্য ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর থেকে বছরের ৩৬৫ দিনই  তার শোকের দিন। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট রোজা রাখার মধ্য দিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুসহ সকলের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আসছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল কুদ্দুস জানান, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি বঙ্গবন্ধুর চিন্তা ধারায় রাজনীতিকে রক্ষা করা। যদি তাই হতো তবে এদেশে  বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতা গ্রহণ, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের পরাজয় এবং ২১ আগস্টের ঘটনা ঘটতো না। দেশে আওয়ামী লীগের প্রকৃত ত্যাগী নেতারা ৯০ ভাগই মারা গেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ ও রাজনীতির উন্নয়নে দিনরাত পরিশ্রম করছেন, নতুন প্রজন্ম এবং বর্তমান আওয়ামী লীগ পদধারীরা একই রকম পরিশ্রম করলে দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবেই গড়ে উঠতো। তারপরও শেখ হাসিনা দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই হাইব্রিডদের তালিকা করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সবাই কাজ করলে দল পুনর্গঠন অসম্ভব নয়।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে আব্দুল কুদ্দুস জানান, অশোকসহ তাদের তিন বন্ধুর পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় জন্য ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে।

তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন

আরও পড়ুন