ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া দম্পতির সঙ্গে এক দুপুরে

সম্পাদনা/লেখক: আব্দুল্লাহ আল মামুন

১৯৮৩ সাল। আমি তখন গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সেই সময়ে পরিচয়, একসঙ্গে দুপুরের খাবার গ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল ডক্টর এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে। প্রিয় নেত্রী হাসু আপার সঙ্গে বিয়ের সূত্র ধরে তিনি আমাদের গোপালগঞ্জের জামাই। আমাদেরই দুলাভাই।

ছিলেন একজন নিরহঙ্কারী মানুষ। ডক্টর ওয়াজেদ মিয়া ১৯৮৩ সালে এসেছিলেন তার শ্বশুর বাড়িতে। সঠিক দিন-তারিখ মনে নেই। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের এই দুলাভাই বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানীর সঙ্গে টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধু ভবনে এক টেবিলে বসে ডাল-ভাত খাওয়ার।

কলেজে গিয়েই শুনি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দুলাভাইসহ টুঙ্গীপাড়া এসেছেন। খবরটি শোনার পর থেকে আপা-দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার একটা আগ্রহ তৈরি হলো। এক বন্ধুকে বললাম টুঙ্গীপাড়া যাওয়ার জন্য। সেও আমার সঙ্গে যেতে রাজি হলো। মোটরসাইকেলে আমরা দুই বন্ধু রওনা হলাম আপা-দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য টুঙ্গীপাড়ার উদ্দেশ্যে। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে পৌনে ১টার দিকে টুঙ্গীপাড়া বঙ্গবন্ধু ভবনে পৌঁছালাম।

jagonews24

কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভবনের কেয়ারটেকাররা বললেন, আপার সঙ্গে দেখা হবে না। কারণ, আপা ওয়াজেদ দুলাভাইকে নিয়ে পারিবারিক সফরে এসেছেন। আমরা কিছুটা হতাশ হয়ে বঙ্গবন্ধু ভবনের নিচ তলার সোফায় মন খারাপ করে বসে পড়লাম। মনে মনে ভাবছি, কষ্ট করে এলাম কিন্তু দেখা হবে না। হঠাৎ দেখি, আমাদের প্রাণপ্রিয় আপা আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোতলা থেকে নামছেন। একেবারেই আমাদের গ্রাম্য মা-বোনদের মতো আটপৌরে শাড়ি পরে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে। আপা আমাদের দেখে দোতলার সিড়িতে দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমরাও দাঁড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে সালাম দিলাম। এরপর আপা আস্তে আস্তে নিচে নামলেন এবং আমাদের নাম-পরিচয় জিজ্ঞাস করলেন।

কী করি, কেন এসেছি— এমন আরও অনেক কথার পর আমরা আপার কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইলাম। বললাম, আপা আমরা তাহলে আসি। আমরা রওনা দেব, এমন সময় আপা পেছন থেকে ডাক দিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, দুপুরের খাওয়া-দাওয়া, আমরা খাওয়া-দাওয়া করেছি কি-না? আমরা বললাম, আপা বাসায় গিয়ে খাব। মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, না তোমরা বসো, এখান থেকে খেয়ে যাবে। এর কিছুক্ষণ পরই রীতিমতো চমকের পালা। ওয়াজেদ দুলাভাইকে সঙ্গে নিয়ে আপা আমাদের দুই বন্ধুকে খেতে ডাকলেন। আমরা গেলাম বঙ্গবন্ধু ভবনের নিচ তলার খাবার ঘরে। সেখানে ছোট একটি পুরোনো দিনের কাঠের টেবিল, ৩/৪ খানা চেয়ার, একটি মিটসেফ রাখা।

jagonews24

এরপর ওয়াজেদ দুলাভাইসহ আমরা দুই বন্ধু খেতে বসলাম এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতে আমাদের তিনজনকে ভাত-তরকারি বেড়ে খাওয়ালেন। খাবার সময় আপা-দুলাভাইয়ের সঙ্গে অনেক কথা হলো। আমাদের প্রিয় হাসু আপা তখন আওয়ামী লীগের সভাপতি। বিরোধী দলের নেতা কিংবা প্রধানমন্ত্রী হননি। সহজ-সরল একজন নেত্রী। বড় বোনের স্নেহে তিনি আমাদের খাওয়ালেন। নিজ হাতেই পরিবেশন করলেন। অন্যদিকে দুলাভাই একজন বড় মাপের বিজ্ঞানী। কোনো অহঙ্কার নেই। খাওয়ার সময় তার হাসি, ঠাট্টা এখনও মনে দাগ কাটে।

পরিচয়ের প্রথমে বেশ রাশগম্ভীর মনে হলেও তিনি ছিলেন খুবই সামাজিক, প্রচণ্ড হাসিখুশি ও মিষ্টভাষী একজন মানুষ। বিশাল ব্যক্তিত্বের অথচ শিশুসুলভ হৃদয়বান মানুষ। সেই ঘটনা, আপা-দুলাভাইয়ের আতিথেয়তা আমার জীবনের সেরা স্মৃতি। অসাধারণ এক দুপুর ছিল সেটি। ছিল অন্যরকম এক অনুভূতি।

jagonews24

জাতির জনকের কন্যা, আমাদের হাসু আপাকে পরে অনেকবার দেখেছি। অনেক নিউজ তার কাভার করেছি, কিন্তু আপা-দুলাভাইয়ের সঙ্গে সেই দুপুরের স্মৃতি আজও অম্লান। সেটা যেন এখনও জীবন্ত। ৩৭ বছর আগের ঘটনা, কিন্তু মনে হয় মাত্র ৩৭ মিনিট আগের। সেই সময় তো ডিজিটাল যুগ ছিল না, সুখস্মৃতিটুকু তাই ধরে রাখতে পারিনি সেলফোন বা ক্যামেরাতে।

তবে মনের ফ্রেমে সেই ছবি ধরা আছে আজও। প্রয়াত দুলাভাই ভালো থাকবেন। আল্লাহপাক আপনাকে বেহেশত নসিব করুন। ভালো থাকবেন আমাদের অতিপ্রিয় হাসু আপা। আপনার হাসিতেই বাংলাদেশ হাসে। আশা, ভরসার আস্থা আপনি। আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন, সুস্থ রাখুন। মহান রাব্বুল আলামিন যেন আমাদের সবাইকে ভালো রাখেন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

আমিনুল হাসান শাহীন, সাংবাদিক, রাজনীতিক; গোপালগঞ্জ থেকে।

জাগো নিউজ, ১১ মে ২০২০, লিঙ্ক

আরও পড়ুন